
শোয়েব হোসেন সংবাদদাতা
জন্মগতভাবেই ঠান্ডা জনিত সমস্যা যেমন শ্বাসকষ্ট,কফ, কাঁশি সহ বিভিন্ন অজানা রোগে আক্রান্ত মুন্নি আক্তার মুক্তি। তার মা মেরিনা আক্তারের অসহ্যকর অভাবের সংসার। ঠিকমতো দুই বেলা দুটো খেতে পান না।তিনি ফুটপাথে ভ্রাম্যমান চা-বিস্কুট বিক্রি করে তিন মেয়ে ও এক ছেলের সংসারের গ্লানি টানছেন। অর্থকষ্ট, সাংসারিক চাপ ও ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে তারা মর্মান্তিক বিপদাপন্ন বহু বছর যাবত।
মুক্তির মা জানান, মুক্তির জন্ম ২০০৭ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। জন্ম থেকেই ঠান্ডা জনিত সমস্যা প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হলে অনেক চিকিৎসকগণ ব্যক্তিগত ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন —
“এ বেশি দিন বাঁচবে না, তাই এত চিকিৎসা করে কাজ নেই “!
কিন্তু, মুক্তির ফুটফুটে হাসি মাখা মিষ্টি মুখখানি দেখে পরিবার পিছ-পা হতে নারাজ। শত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও সকলের দোয়ার বরকতে সেই মুক্তি বিস্ময়কর ভাবে দেখতে দেখতে আজ সুন্দরী কিশোরী ও নবম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী। সকলের মনেই মুক্তির উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আশার প্রদীপ জ্বলজ্বল করছে!
চার ভাই বোনের মধ্যে মুক্তি সবার ছোট। বাবা তাসেম আলী যেন থেকেও নেই।তিনিও অসুস্থ্যতা ও দারিদ্রতার করাল গ্রাসের শিকার এবং আয়-রোজগারহীন । তারা ভূমিহীন ও গৃহহীন। ফুটপাথে কোন রকম ভ্রাম্যমান বেঁচা বিক্রি করেই শীত-গ্রীষ্ম, রোদ-বৃষ্টি ও নানান বাঁধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করে তাদের অসহনীয়, দুর্বিসহ, আপোষহীন ও ভয়ঙ্কর জীবন যুদ্ধ চলছে।
খবর নিয়ে জানা যায়, মাসের পর মাস তাদের বাড়ি ভাড়া বাকি থাকছে। তার ওপর আরো বাকি মুক্তির স্কুল ও কোচিংয়ের কয়েক মাসের বিভিন্ন বেতন। তার লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ বহন পুরোপুরি অসম্ভব বিধায় বন্ধ হবার উপক্রম হয়ে দাঁড়িয়েছে । তার বড় বোন টুম্পা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি কর্তৃক নির্যাতিতা হয়ে অসুস্থ হয়ে আছে কয়েক বছর। ভাইটিও এক রকম বেকার। সব মিলে যেন মরার উপর খাড়ার ঘাঁ! তারা প্রায় ২২ বছর ধরে রাজধানীর দক্ষিণখানের তেঁতুলতলা বেকারী সংলগ্ন এলাকার ভাড়াটে এবং সরকারি মোল্লারটেক উদয়ন স্কুল এন্ড কলেজের ছাত্রী এই মুক্তি। দেশের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের চামাগ্রাম (৩নং ওয়ার্ড)।
লেখাপড়ার অবসরে মুক্তিও মায়ের সহযোগিতা করতে ফুটপাথে সময় দেয়। রুপসী মুক্তিকে বসতে দেখে অনেকেই অবিশ্বাসের সাথে অবাক হয়ে নানান প্রশ্নের ঝড় তোলেন। সেই সাথে চাঁদাবাজ,বখাটে,মাস্তান-সন্ত্রাসী এবং নেশাখোর-মাতালদের দ্বারা অনাকাঙ্ক্ষিত বিদঘুটে উৎপাত ও ভয়াবহতা মুহুর্তের ব্যাপার মাত্র! সেই উদ্ভট পরিস্থিতি সহজেই অনুধাবন করা যায়।
পারিবারিক সূত্রে মুক্তির অসুস্থতা ও চিকিৎসা জনিত বিষয়ে জানা যায়, চিকিৎসার অভাবে দিনে দিনে সারা শরীর চুলকানির সাথে ঘাঁ ও পুঁজ হয়ে দাগে ভরে গেছে।বিভিন্ন গীরায় ব্যথা। দেহের ভেতর পানি জমে শরীর অস্বাভাবিক ভাবে ফুলে-ফেঁপে অকাল বার্ধকের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে যোগ দিয়েছে স্মরণ শক্তিহীনতা, চুলপরা, চোখের নিচে কালো দাগ, নানান দুর্বলতা, পুষ্টিহীনতা ও অতিমাত্রায় খাদ্য গ্রহণ প্রবণতা ইত্যাদি।বর্তমানে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে এবং পিত্তথলীতে পাথর ও ইউরিন ইনফেকশন সনাক্ত করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার যে, এতো সমস্যা সত্বেও সুস্থ্য ও সুন্দর জীবন নিয়ে বাঁচার প্রবল প্রচেষ্টায় ছোট থেকে অদ্যাবধি মেধাবীদের তালিকাতেই রয়েছে মুক্তি! জন্মথেকেই একদিকে নিরব মৃত্যুর হাতছানি, অপরদিকে উন্নত-উজ্জ্বল ভবিষ্যত গঠনের প্রাণপণ তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেন অবিরাম পাঞ্জা লড়ছে।
আশার বাণী হিসেবে পাওয়া যায়, বর্তমানে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির নব নব উদ্ভাবনীতে চিকিৎসা পদ্ধতির প্রভূত উন্নয়ন ঘটেছে। বেশ কয়েকজন চিকিৎসা গবেষক ও কনসালটেন্ট জানিয়েছেন – “বিদেশে নয়, উন্নত চিকিৎসা পেলে দেশেই সমস্ত ব্যাধি সনাক্ত ও নিরাময় সম্ভব হতে পারে! তবে তা সময় সাপেক্ষ্য ও ব্যয়বহুল বটেই ! তারপরও যদি আরও কিছু জটিলতা পাওয়া যায় তাহলে উন্নত দেশেই চিকিৎসা নেয়া উচিৎ”।
পাড়া-পড়শি ও শুভাকাঙ্ক্ষীগণ সকলেই একযোগে মুক্তিদের পরিবারকে নিরীহ, ভদ্র ও বিনয়ী হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাদের মতে
” গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে এবার আমরা মুক্তির শিক্ষা, চিকিৎসা সহ তাদের পারিবারিক আয় – উন্নতি দেখতে চাই “।
কল্যাণমুখী সাংবাদিকদের সহযোগিতায় মুক্তি ও তার পরিবারের সামনে বেশ কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ তুলে ধরলে সবাই অবাক বনে যান এবং আচমকা মুক্তির নিরবতা ভাঙে ! সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের কাছে অবশেষে আবেগ আপ্লূত কাদোঁ কাদোঁ স্বরে মুক্তি বলে ওঠে —
” আসলে ভাইয়া জানেন, অনেক বড়ো বড়ো মাপের মানুষের কাছে সহায়তার জন্য আমার বাসার সবাইকে ছোট বেলা থেকেই বহুবার অনুরোধ করতে দেখেছি। শুধু ইচ্ছে করলেই অনেক কিছু করার যথেষ্ট ক্ষমতা ও সাধ্য তাদের ছিলো! কিন্তু, সকলেই শুধু বড়ো বড়ো কথা বলে সময় নষ্ট করলেও অবশেষে তারা মশকরা ছাড়া কিছুই করেনি! তাই অনেক কারণে আপনাদের সাথে খোলামেলা কথা বলার ইচ্ছেই হয়নি। আপনারা আমাদের ভেতরের সমস্যা গুলো যেভাবে এতোগুলো গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তা সত্যিই আমার চোখকেও বিশ্বাস করাতে পারছি না! আমি সুস্থ্য হয়ে লেখাপড়া করে অনেক বড়ো হতে চাই।আমি মা-বাবার মুখে হাসি ফোঁটাতে চাই। আমরা পরিবার সহ অসহ্যকর অভাবের যন্ত্রণা ও সমস্ত অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে চাই। আপনারা অবশ্যই পারবেন!যেভাবেই পারেন আমাদের সাহায্য করুন, প্লিজ ভাইয়া “….
…..!!