
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ : গত ৪ নভেম্বর রূপগঞ্জে পরিবেশ দূষণের দায়ে ভুলতা এলাকার অনিক নিট কম্পোজিট, তেঁতলাবো এলাকার এসিএস টেক্সটাইল মিলস ও মৈকুলী এলাকার বিক্রমপুর স্টিল মিলস কারখানায় রূপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তারিকুল আলমের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে সাড়ে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন।রূপগঞ্জে প্রায় ৪৫০ লোকের মৃত্যু হয় বলে জানা গেছে। এখানেই শেষ নয়, দূষণের কারণে বছরে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ শ্বাসকষ্ট রোগে ভোগে। আর রূপগঞ্জে বায়ু, পানি ও পরিবেশ দূষণে বছরে ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জের ২৩টি তৈরি পোশাকশিল্পের ওয়াশিং ও ১৪টি ডাইং কারখানার বর্জ্য দূষণের অন্যতম উৎস। ক্যামিকেল মিশ্রিত দূষিত পানির দূর্গন্ধে কেউ নাকেমুখে কাপড় গুজে রাখছে কেউবা দূর্গন্ধ থেকে বাচঁতে মুখে মাষ্ক পড়ে চলাচল করছে। ক্যামিকেল মিশ্রিত পানি দেখলে যে কারো মনে হবে যেনো রক্ত ঢেলে রেখেছে। ক্যামিকেল মিশ্রিত পানি ইটিপি ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালে ফেলার কারণে দূর্ভোগ ও স্বাস্থ্য ঝুকিতে রয়েছে ২২ গ্রামের প্রায় ২ লাখ বাসিন্দা।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, উপজেলা ভুলতা এলাকা থেকে মুড়াপাড়া হয়ে শীতলক্ষ্যা নদী পর্যন্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি খাল রয়েছে। এ খালটির দুইপাশে মর্তুজাবাদ, ভুলতা, পাচাইখা, ভায়েলা, সোনাব, মাছুমাবাদ, পেরাব, হাটাব, আমলাবো, গোলাকান্দাইল, মুড়াপাড়া, ঋষিপাড়া, ত্রিশকাহনীয়া, আমলাবো, কালি, আওখাবো, বলাইখাসহ প্রায় ২২ গ্রামের মানুষের বসবাস। এ খালের পানি দিয়ে কৃষকরা কৃষি জমিতে পানি দেওয়া ও সেচ কাজ পরিচালনা করতো। এসকল গ্রামের মানুষ বেশিরভাগই কৃষি পেশার নির্ভরশীল ছিল।
কোন প্রকার ইটিপি ছাড়াই তাদের ডাইংয়ের বিষাক্ত বর্জ্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের খালে ফেলতে শুরু করেন। কারখানায় ডাইংয়ের জন্য বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। ক্যামিকেলের বিষাক্ত গ্যাস এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়াসহ নানা ধরনের জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ক্যামিকেলের পানি ফেলার কারণে কৃষকরা সেচ কাজ করার ফলে তাদের ফলন কমতে থাকে। বিষাক্ত পানি দিয়ে সেচ বন্ধ করে দেওয়া হলে কৃষি জমিতে ফসল ফলা বন্ধ হয়ে যায়।রুপগঞ্জের কারখানার বেশিরভাগই ইটিপি প্ল্যান নেই। অবৈধ ভাবে সরাসরি কেমিক্যাল মিশ্রিত বর্জ্য বিভিন্ন খালে প্রকাশ্য দিবালোকে ফেলা হচ্ছে।
কথা হয় কৃষক চান মিয়া, আবেদ আলী, সুলতান মাহমুদ ও আসলাম মিয়ার সঙ্গে। তারা বলেন, বাবাগো কয় বছর আগেও জমিতে ধান লাগাইলে অনেক ফলন পাইতাম। কিন্ত আপন টেক্সটাইলের ডাইয়িং কারখানার ক্যামিকেলের পানির কারণে ফলন আর আগের মতন হয় না। তাই লাইগ্যা চাষাবাদ ছাইড়া দিয়া ভ্যান চালাইয়া সংসার চালাইতাছি।
স্থানীয় জেলে শোকলাল বলেন, আগে শীতলক্ষ্যা নদী থেইকা কত্তো রহমের মাছ ধরছি কিন্তু অহন নদীতে কোন মাছ নাই। কারখানার ময়লা পানি ফেলানোর কারণে নদীর পানি অহন আলকাতরার মতন হইয়া গেছে। তাই নদীতে এখন আর কোন মাছ পাওন যায় না।
আপন ডাইংয়ের আবুল হোসেন বলেন, আমাদের ইটিপি আছে। নিয়ম মেনেই ময়লা নিষ্কাশন করি।
পরিবেশ অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জের উপ-পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, এখানকার পরিবেশ অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আমরা কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আইভী ফেরদৌস বলেন, ক্যামিকেল মিশ্রিত পানি পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক এবং এটি মানবদেহের হুমকি সরূপ। ক্যামিকেলে মিশ্রিত পানির সংস্পর্শে গেলে চর্মরোগ, আলসার, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দূরারোগ্য রোগ মরনব্যাধি হতে পারে।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। যেহেতু আপনার মাধ্যমে জেনেছি বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।######