
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ ঃ ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার নাম উঠতেই কারও মনে হবে এখানে আন্তর্জাতিক মানের পণ্য বিক্রি হয়। দেশি-বিদেশি গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য পাওয়া যাবে। যা সচরাচর বাজারে পাওয়া যায় না। মেলাকে ঘিরে বিদেশি পণ্যের সঙ্গে দেশীয় ক্রেতাদের পরিচিতি এবং দেশীয় পণ্যের সঙ্গে বিদেশিরা পরিচিত হবেন। তবে বাস্তবিক অর্থে উলটো চিত্র দেখা গেছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায়। মেলার ভেতরে নিুমানের পণ্য ফুটপাতের মতো করে সাজিয়ে বিক্রি হচ্ছে অবাধে।
চকবাজারের বিভিন্ন মানহীন পণ্যে সয়লাব মেলার বেশির ভাগ স্টল। পণ্য নিম্নমানের হলেও দাম কয়েকগুণ বেশি। সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলার মূল উদ্দেশ্য থাকে বিদেশি ক্রেতা-বিক্রেতা অংশ নেবেন এবং পণ্যের গুণগত মান যাচাই করবেন। পছন্দ হলে কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ দেবেন। অন্যদিকে দেশীয় আমদানিকারকরা আমদানির পণ্য খুঁজতে বিদেশ না গিয়ে মেলার মাধ্যমে সেই সুযোগ লুফে নেবেন। তবে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় এ দুটি উদ্দেশ্যের কোনোটির যথাযথ প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে দাবি ব্যবসায়ী ও মেলায় আসা দর্শনার্থীদের। মেলায় কোনো বিদেশি দর্শনার্থী বা পর্যটকও চোখে পড়ে না। বিদেশি স্টলেও দেশি পণ্য বিক্রি হতে দেখা গেছে। মেলায় মিলছে চকবাজারের নিম্নমানের আচার, চকোলেট, জেলিসহ শিশুদের নানা খাবার। এসব দোকানে বিদেশি বিভিন্ন চকোলেট বিক্রি হলেও নেই কোনো আমদানিকারকের সিল ও পণ্যের মূল্য। চকবাজার থেকে আনা নকল প্রসাধনীতে নামিদামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। গৃহস্থালি পণ্যগুলোতেও বিভিন্ন নামিনামি ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে ছাড়ের নামে বিক্রি করা হয়। মেলায় পোশাক পণ্যেও রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। শাল, থ্রিপিস ও তাঁতের শাড়িগুলো ভারতীয়, পাকিস্তানি ও কাশ্মীরি বলে বিক্রি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ কাপড় নরসিংদীর বাবুরহাট, গাউছিয়া ও ইসলামপুর থেকে কিনে এনে মেলায় উঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
এদিকে মেলায় দেশীয় পণ্যের নামিদামি ব্র্যান্ডের স্টলগুলো বিপাকে পড়েছে মানহীন পণ্যে সয়লাবের কারণে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের যেসব প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে, মানহীন পণ্যের কারণে তারা সেভাবে ব্র্যান্ডিং করতে পারছে না বলে অভিযোগ কিছু ব্যবসায়ীর। রূপগঞ্জের রূপসী এলাকা থেকে আকাশ পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, বাণিজ্যমেলায় স্ত্রী ও দুই ছেলে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলাম। কিন্তু মেলায় আন্তর্জাতিক পণ্যের চেয়ে চকবাজারের পণ্য বেশি।
এ ছাড়া মেলার ভেতরে মূল ভবনের পেছনের দিকে নকল হাজির বিরিয়ানিসহ ১২- ১৫টি অস্বাস্থ্যকর খাবারের দোকান বসাতে দেখা গেছে। অস্বাস্থ্যকর খাবারের পসরা সাজিয়ে নাকের ডগায় জম্পেশ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে ভুঁইফোড় রেস্তোরাঁ লো। মেলার ভেতরে এসব দোকানের আধিক্যের কারণে জৌলুশ হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক এই মেলা। পণ্যের মান ও অস্বাভাবিক মূল্যের অভিযোগ যেন পিছু ছাড়ছে না। এর ফলে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আসল উদ্দেশ্যই হয়ে গেছে ‘নিরুদ্দেশ’। দেশের সবচেয়ে বড় এ মেলার নামের সঙ্গে আন্তর্জাতিক’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হলেও গেল তিন দশকে সেই মানে পৌঁছাতে পারেনি।
মেলায় কাপড়জাত পণ্যেও রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। শাল, থ্রিপিস ও তাঁতের শাড়িগুলো ভারতীয়, পাকিস্তানি ও কাশ্মীরি বলে বিক্রি করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বেশিরভাগ কাপড়ই নরসিংদীর বাবুর হাট, গাউছিয়া ও ইসলামপুর থেকে কিনে এনে মেলায় ওঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দেশি স্টলে রপ্তানিযোগ্য পণ্য নেই।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করা ভারত, তুরস্ক, পাকিস্ত ানসহ বিভিন্ন দেশের পণ্য দেখে আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা যদি নতুন উদ্ভাবন করতে পারেন, তাহলেই আমি বলব মেলার আয়োজন সার্থক। যদি নিম্নমানের পণ্য বিক্রি ও এটিকে বছরের একটি ইভেন্ট হিসেবে ধরা হয়, তাহলে এটি কোনো কাজে আসবে না।’
মেলার পরিচালক ও ইপিবির সচিব বিবেক সরকার বলেন, ‘আমরা মেলাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে পুরোপুরি চেষ্টা চালাচ্ছি। মেলা মাত্র দুদিন হলো উদ্বোধন হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে মেলার কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়ে যাবে।###