
মোঃ জারিফ আল হামিদ
৪র্থ বর্ষ, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন (RSF)-এর এক পরিসংখ্যান বলছে, শুধু এক অক্টোবর মাসেই বাংলাদেশে ৪৮৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৪১ জন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১,১২৮ জন, যাদের মধ্যে রয়েছে অন্তত ৬৩ জন শিশু। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে ছিন্নভিন্ন হওয়া পরিবার, চিরতরে ব্যাহত হওয়া জীবন এবং দেশের অর্থনীতির ওপর এক বিরাট আঘাত। সড়ক সুরক্ষার জন্য কর্তৃপক্ষ বারবার নিরাপদ ড্রাইভিং এবং কঠোর আইনের কথা বললেও বাস্তব চিত্রে দুর্ঘটনা প্রতিরোধই শেষ কথা নয়। যখন জীবনহানি বা গুরুতর শারীরিক ক্ষতি ঘটে, তখন দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের জন্য যথাযথ আইনি প্রতিকার এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমানভাবে জরুরি।
বাস্তবে, সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবার সাধারণত ফৌজদারি আইনি কাঠামোর উপর নির্ভর করে। তারা চালকের অবহেলাজনিত কার্যক্রমের (negligent action) বিরুদ্ধে মূলত শাস্তি চেয়ে মামলা করে বসেন। যদিও ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত জরুরি কিন্তু এটি আর্থিক ক্ষতি পূরণের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। যখন কোনো পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম সদস্য মারা যান, বা গুরুতর আহত হন তখন চালকের শাস্তি নিশ্চিত হলেও পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, চিকিৎসা খরচ বা দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণে তা ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের আশু প্রয়োজন আর্থিক ক্ষতিপূরণ (Civil Compensation), যেটি তাদের আর্থিক নিরাপত্তা প্রদান করবে এবং জীবন পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। কিন্তু প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় এর সুযোগ সীমিত।
বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ এর অধীনে স্বীকৃত ‘জীবনের অধিকারথ শুধু জীবন ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে এই অধিকারের বিস্তৃত ব্যাখ্যা প্রদান করেছে, যার অন্তর্ভুক্ত প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি থেকে সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির অধিকার। আদালতের পর্যেবক্ষণে স্পষ্ট যে, যখন কোনো ব্যক্তি অবহেলা বা অসতর্কতার কারণে জীবনহানি বা শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হোন, তখন রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণসহ আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তায়। সড়ক পরিবহন আইন (RTA) ২০১৮ এবং সড়ক পরিবহন বিধিমালা (RTR) ২০২২-এর অধীনে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাস্তবে, এই বিধিবদ্ধ প্রতিকার প্রক্রিয়াসমূহ প্রায়শই দীর্ঘ, জটিল আবেদন প্রক্রিয়া এবং অপ্রতুল আর্থিক সহায়তার কারণে কার্যকরভাবে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা প্রয়োজনীয় সময়ে পর্যাপ্ত সহায়তা পায় না। এভাবে, সাংবিধানিক অধিকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবিক আইনি প্রতিকারের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট এবং গুরুতর ফারাক পরিলক্ষিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে, প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের দায়বদ্ধতা (Vicarious Liability) নীতির গুরুত্ব অপরিসীম। এই নীতির মূল কথা হলো, নিয়োগকর্তা, যেমন একটি পরিবহন কোম্পানি বা বাস মালিক তার কর্মচারী বা চালকের দ্বারা কর্মক্ষেত্রে সংঘটিত ত্রুটিপূর্ণ বা অবহেলাজনিত কাজের জন্য দায়ী থাকবেন। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে, ক্ষতিপূরণের আর্থিক দায়ভার তিনিই বহন করবেন, যিনি অর্থ পরিশোধে সক্ষম, অর্থাৎ, সাধারণত নিয়োগকর্তা; কেবল কর্মচারী নন। এর ফলস্বরূপ, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা যেমন দ্রুততম সময়ে ও যথাযথ আর্থিক প্রতিকার লাভে সক্ষম হবেন, তেমনি এই নীতি নিয়োগকর্তাদের দায়বদ্ধ কর্মসংস্কৃতি বজায় রাখতে এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টিতে বাধ্য করবে। বাংলাদেশে এই নীতির সার্বিক গুরুত্ব প্রমাণের জন্য বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ বনাম রওশন আখতার (২০১৬) মামলাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত। এই মামলায়, চালকের অবহেলাজনিত আঘাতে এক পথচারীর মৃত্যু ঘটলে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে নিয়োগকর্তার প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের দায়বদ্ধতা স্বীকার করেন এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ১.৭১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। বাংলাদেশের টর্ট আইনে এই রায়টি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্থাপন করে। এটি প্রমাণ করে যে, (Vicarious Liability) নীতি কার্যকরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারের আর্থিক দুর্দশা দ্রুত লাঘব করা সম্ভব। যদি এই নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হতো, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে কেবল ফৌজদারি মামলা বা জটিল আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হতো না। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে দায়বীমা (Liability Insurance) ব্যাপকভাবে প্রচলিত, সেখানে ক্ষতিপূরণ প্রায়শই বিমার মাধ্যমে প্রদান করা হয় যা দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এই ধরনের বিস্তৃত ও বাধ্যতামূলক দায়বীমা কাঠামোর অভাব রয়েছে, ফলে নীতিটি কার্যকর হওয়া এবং ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া প্রায়শই অনিশ্চিত থেকে যায়।
সবশেষে, সড়ক দুর্ঘটনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেবল দুর্ঘটনা প্রতিরোধ বা দোষীর ফৌজদারি শাস্তিই যথেষ্ট নয়। বর্তমান আইনি কাঠামোয় নাগরিক ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে যে প্রকট শূন্যতা রয়েছে, তা স্পষ্ট। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যখন আর্থিক প্রতিকারের বদলে শুধু ফৌজদারি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়, তখন ন্যায়বিচার পূর্ণতা পায় না। এই অচলাবস্থা দূর করতে আইনগত সংস্কার অপরিহার্য: নিয়োগকর্তার প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বের দায়বদ্ধতা (Vicarious Liability) কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে এবং এর পাশাপাশি একটি বাধ্যতামূলক ও বিস্তৃত দায়বীমা (Liability Insurance) কাঠামো প্রবর্তন করা প্রয়োজন। এই সমন্বিত পদক্ষেপই বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য দ্রুত, যথাযথ ও নিশ্চিত আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রকৃত ন্যায় ও মানবিক সুরক্ষা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
মোঃ জারিফ আল হামিদ
৪র্থ বর্ষ, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়