
ঢাকা শহরের ব্যস্ত সড়কে স্থাপিত ক্যামেরাগুলো এখন শুধু যানবাহনের নম্বর প্লেটই নয়, মানুষের মুখও শনাক্ত করতে পারে। সীমান্ত এলাকায় স্মার্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ব্যবহৃত হচ্ছে। পুলিশ বিভাগ ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ডেটা বিশ্লেষণের জন্য—কে অপরাধ করতে পারে, এ ধরনের তথ্য সংগ্রহে আগ্রহ দেখাচ্ছে। এসবই সম্ভব হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ কি ন্যূনতম আইনি ও নৈতিক প্রস্তুতি নিয়েছে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশে মামলার জট দিন দিন বাড়ছে। তাছাড়া ন্যায়বিচার পেতে মানুষের বছরের পর বছর হয়রানি ও সময় নষ্ট হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ডিজিটাল প্রযুক্তিকে একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। তবে বিচারব্যবস্থায় এআইয়ের মতো জটিল প্রযুক্তি যুক্ত হলে ন্যায়বিচার আরও দূরে সরে যেতে পারে, এবং এটি বৈজ্ঞানিকভাবেও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। একই সঙ্গে মুখ শনাক্তকরণ ক্যামেরা স্থাপন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে ঢাকা সহ বড় শহরগুলোতে অনলাইন নজরদারি বেড়েছে। কারণ এসব ব্যবহারের ওপর নজরদারির জন্য কোনো স্বাধীন সংস্থা নেই, নেই নির্দিষ্ট আইনও।
প্রস্তাবিত ডেটা প্রোটেকশন আইনটি ইতোমধ্যে মানবাধিকার কর্মীদের কাছে অ-উদার ও রাষ্ট্রের অপব্যবহারের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তারা বলছেন, নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হবে, কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, এবং কে সংগ্রহ করবে,এই মৌলিক বিষয়গুলো আইনে স্পষ্ট নয়। তাছাড়া ভুল বা অপব্যবহারের ক্ষেত্রে নাগরিকরা কীভাবে প্রতিকার পাবেন, সেটিও নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তির প্রতি আস্থা বাড়ার বদলে সন্দেহই বাড়ছে। বিশেষ করে সরকার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের দ্বারা এর অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সিসিটিভি, সাইবার মনিটরিং ও মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণের মতো নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ভবিষ্যতে এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে প্রেডিকটিভ পুলিশিং ও ডেটা প্রোফাইলিং। এতে অপরাধ দমন জোরদার হলেও, যদি এটি রাজনৈতিক বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর মারাত্মক আঘাত আসতে পারে।
সম্প্রতি চ্যাটজিপিটি ও জেমিনির মতো এআই টুল দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে। আইনজীবী, সাংবাদিক, গবেষক এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও এগুলো ব্যবহার করছেন। কিন্তু এসব টুল অনেক সময় ‘হ্যালুসিনেশন’ তৈরি করে,অর্থাৎ বাস্তবতার সঙ্গে মিল নেই এমন তথ্য দেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এদের তথ্যের উৎস স্পষ্ট নয়; ব্যবহারকারীরা প্রায়ই জানেন না তথ্যগুলো কোথা থেকে এসেছে। এর ফলে আইনি নথি প্রস্তুত, সাক্ষ্য বা যুক্তি উপস্থাপনে গুরুতর ভুল হতে পারে। আরও ভয়াবহ হলো, এআই বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। অতীতের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য প্রায়ই অসম, পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত। সেই ডেটার ভিত্তিতে যদি কোনো এলাকা বা শ্রেণিকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে প্রকৃত অপরাধ না করলেও তারা পুলিশি নজরদারি ও হয়রানির শিকার হতে পারে। এতে দরিদ্র, সংখ্যালঘু ও রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমতাবলম্বী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য আরও তীব্র হবে। ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায্য বিচারের অধিকার ও আইনের দৃষ্টিতে সমতা। বাংলাদেশে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন ও সাইবার সিকিউরিটি আইন ইতোমধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগের মুখে রয়েছে।
এখন বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন,এই প্রযুক্তিকে কি আমরা ন্যায়বিচারের সহায়ক হিসেবে গড়ে তুলতে পারব? নাকি যথাযথ তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া এআই নাগরিক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি হাতিয়ার হয়ে উঠবে? প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের থামার সুযোগ দেয় না। তাই প্রয়োজন স্বচ্ছতা, অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন এবং কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা। নইলে এআই ন্যায়বিচার নয়, বরং অন্যায়ই আরও বাড়িয়ে দেবে।
Written By
Nawshin Sultana
School of Law
BRAC University