
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
পিচ উঠে গেছে, বেরিয়ে পড়েছে ইটের খোয়া। কোথাও সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, কোথাও জমে আছে কাদা ও মাটি। বৃষ্টিতে খানাখন্দে পানি জমে পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও ভয়াবহ। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটি একসময় পাকা সড়ক ছিল। বেহাল এই সড়কে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ। ঘটছে দুর্ঘটনা, বিকল হচ্ছে যানবাহন, সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও নাউতারা ইউনিয়নের মানুষ।
রংপুর-ডিমলা জাতীয় সড়কের সর্দারহাট থেকে বুড়িরহাট পর্যন্ত আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে বুড়িরহাট থেকে নাউতারা বাজারের চৌপতি পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার সড়কে দায়সারা সংস্কার কাজ করা হলেও কাজের গুণগত মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। নাউতারা বাজার চৌপতি থেকে সোনামণির ডাঙ্গা ইউপি ভবন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার সড়ক চলাচলের উপযোগী থাকলেও সোনামণির ডাঙ্গা ইউপি ভবন থেকে সর্দারহাট জাতীয় সড়কের সংযোগস্থল পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সড়কটি পার্শ্ববর্তী ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের বাসিন্দাদের উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ। স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউনিয়নটির সঙ্গে উপজেলা সদরে যাতায়াতের জন্য এটিই একমাত্র সরাসরি সড়ক। বিকল্প পথে ঘুরে উপজেলা সদরে যেতে হলে প্রায় ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় ও অর্থ দুটিরই অপচয় হচ্ছে। বিশেষ করে রোগী, শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
সড়কটি শুধু তিন ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদরে যাতায়াতের পথ নয়, নাউতারা বাজারে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে দীর্ঘদিন সড়কটি বেহাল থাকায় স্থানীয় জনজীবনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক দিয়েই উপজেলা সদরে যেতে হয়। বেহাল সড়কের কারণে রোগী বহনকারী যানবাহন চলাচলেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার প্রয়োজন হলেও খানাখন্দের কারণে যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারে না। এতে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের ক্ষেত্রেও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ। উপজেলা সদরের ডিমলা ইসলামিয়া ডিগ্রি মহাবিদ্যালয়, ডিমলা সরকারি মহিলা কলেজ ও ডিমলা কামিল (মাস্টার্স) মাদ্রাসায় ঝুনাগাছ চাপানীসহ আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত যাতায়াত করেন। বেহাল সড়কের কারণে তাঁদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এ সড়কের পাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ডিমলা কামিল (মাস্টার্স) মাদ্রাসা, নাউতারা আবিউন্নেছা দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়, নাউতারা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীদেরও প্রতিদিন ভাঙাচোরা সড়ক পাড়ি দিতে হচ্ছে।
সড়কের পাশে রয়েছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ২০ এমভিএ পাওয়ার সাবস্টেশন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটলে জরুরি পরিস্থিতিতে বেহাল সড়কের কারণে দ্রুত সেখানে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে জরুরি সেবাদানকারী যানবাহনের চলাচলও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নাউতারা বাজারে রংপুর, জলঢাকা, সৈয়দপুর, নীলফামারী, ডোমার, ডিমলা উপজেলা সদরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকে করে পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। বাজারে পণ্য খালাস করে এসব ট্রাক আবার ফিরে যায়। নিয়মিত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে সড়কের বেহাল অংশ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্ষাকালে খানাখন্দ ও কাদার কারণে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ট্রাক, ভ্যান, অটোভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন বিকল হয়ে পড়ে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সর্দারহাট চৌপতি থেকে সোনামণির ডাঙ্গা ইউপি ভবন পর্যন্ত সড়ক ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে ইটের খোয়া বেরিয়ে আছে। কোথাও কোথাও সড়কটি কাঁচা মাটির সড়কে পরিণত হয়েছে। সড়কের দুই পাশে ঢালের মাঝবরাবর বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দুটি গাড়ি পাশাপাশি চলাচল করতে পারছে না। ভারী যানবাহনের পাশাপাশি অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশা চলাচল করলেও গর্তের কারণে ধীরগতিতে চলতে হচ্ছে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান স্থানীয়রা।
নাউতারা ইউনিয়নের সোনামণির ডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, ‘এই সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই বেহাল। কোথাও খানাখন্দ, আবার কোথাও ঢিবির মতো উঁচু-নিচু। সড়কটি এখন একেবারেই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।’
ভাটিয়াপাড়া গ্রামের হযরত আলী, আব্দুল লতিফ, ওমর ফারুকসহ ১০ জন কৃষক বলেন, তাঁদের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য নাউতারা বাজার ও উপজেলা সদরের হাটবাজারে নিতে হয়। কিন্তু ভাঙাচোরা সড়কের কারণে সময়মতো পণ্য বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ভ্যানচালকেরাও পণ্য পরিবহনে আগ্রহ দেখান না। কেউ রাজি হলেও বেশি ভাড়া দিতে হয়।
নাউতারা ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জব্বার বলেন, ‘খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও নাউতারা ইউনিয়নের মানুষের জন্য সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে বেহাল থাকায় শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষকসহ সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। জনদুর্ভোগ লাঘবে সড়কটি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানাচ্ছি।’
নাউতারা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. আশিক ইমতিয়াজ মোর্শেদ মনি বলেন, ‘এই সড়ক দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে মানুষ প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। সড়কটি সংস্কারের বিষয়ে স্থানীয় এলজিইডির প্রকৌশলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। তাঁরা জানিয়েছেন, সড়কটি সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।’
এলজিইডির ডিমলা উপজেলা প্রকৌশলী মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘সড়কটি সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সড়কটি মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।’