
মারুফ আহম্মেদ,খুবি প্রতিনিধি
সম্প্রতি ডাকসু ও জাকসু, নির্বাচনকে ঘিরে যে আমেজের জন্ম দিয়েছে এতে অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। তবে,
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পক্ষে বিপক্ষে হয়েছে নানা আলোচনা। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অল্পসংখ্যক তাদের অধিকার ও দাবিআদায়ে ছাত্রসংসদ চাচ্ছে অপরদিকে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ধারা ১৬ নম্বরে বলা হয়েছে, “ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের লিখিত অনুমতি ছাড়া অধ্যাদেশ বলে গঠিত বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, হল ছাত্র সংসদ, ডিসিপ্লিনের ছাত্র সমিতি ব্যতিত অন্য কোনো ক্লাব অথবা সমিতি অথবা ছাত্র সংগঠন গঠন করা যাবে না”।
বিশেষজ্ঞদের মতে, “ছাত্র সংসদ হলো এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ব্যানার নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়। এর কাজের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, একাডেমিক ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সুবিধা নিশ্চিত করা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং শিক্ষার্থীদের নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করা। এছাড়া বুলেটিন-পত্রিকা প্রকাশ, বিতর্ক, সংগীত, আবৃতি ও খেলাধুলার আয়োজনও করা হয়”।
সরেজমিনে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের মতে ছাত্র সংসদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম এবং এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আশঙ্কা প্রকাশ করেন, নির্বাচন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি হতে পারে, যা প্রতিনিধিত্বের বদলে সহিংসতার দিকে ধাবিত করার ঝুঁকি রাখে।
নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী উসামা মুসান্না চৌধুরী বলেন, “খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের দাবি উত্থাপনের কোনো অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্ম নেই। এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সিনিয়রদের নেতৃত্বে বিভিন্ন ইস্যুর সমাধান করেছে। তবে ’২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক অধিকার সচেতন হয়েছে এবং যেহেতু বর্তমান প্রশাসন সেই আন্দোলনের ফল, তাই তাদের কাছে প্রত্যাশাও বেশি। এজন্য দাবি উত্থাপন ও প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনতে একটি দায়বদ্ধ প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধকরণ ছিল শিক্ষার্থীদের ইচ্ছার প্রতিফলন, কোনো সরকারি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। তাই ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা যদি মনে করে অধিকার আদায় ও জবাবদিহিতার জন্য ছাত্র সংসদ দরকার, তবে তা বিবেচনা করতে হবে। তবে শুধু ছাত্র সংসদ নির্বাচনই একমাত্র পথ নয়; প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও এসব ইস্যুর সমাধান সম্ভব”।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ রেজোয়ানুল হক রাদ বলেন,”দীর্ঘদিন ধরেই খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম নেই। শিক্ষার্থীরা আবাসন সমস্যা,খাবার সমস্যা,বিশুদ্ধ খাবার পানিসহ বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়াগুলো প্রশাসনের কাছে যথাযথভাবে উত্থাপনের কোনো মাধ্যম নেই।এজন্য আমি মনেকরি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটা প্রতিনিধিত্বমূলক প্ল্যাটফর্ম থাকবে সেটা হতে পারে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা অন্য কোন মাধ্যম। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পাসে রাজনীতি ঢুকতে পারে। এজন্য বিকল্প হিসেবে প্রত্যেক ডিসিপ্লিন থেকে একজন দুইজন করে প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রতিনিধিত্বশীল প্লাটফর্ম গঠন করে যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিনিধিত্বশীল প্লাটফর্ম থাকা অতীব জরুরী”।
ফিশারিজ এন্ড মেরিন রিসোর্স টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রাফিন মাহফুজ বলেন, “খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রশাসনের সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত ধরা হয়। তবে কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছাত্রজিম্মি ও মিথ্যা ফাঁসানোর অভিযোগ আছে। তিনি বলেন, অন্য রাজনৈতিক ক্যাম্পাসের মতো বাম-ডান আধিপত্য এখানে চান না। কিন্তু স্বতন্ত্র ও প্রভাবমুক্ত নির্বাচন হলে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ প্রয়োজন, যা ছাত্রদের পক্ষে কথা বলার প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। বর্তমানে অনেক শিক্ষক দুর্নীতিতে যুক্ত হলেও প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। তাই কালচার পরিবর্তন জরুরি এবং বাহ্যিক প্রভাবমুক্ত রাজনীতি চর্চার সুযোগ থাকা উচিত”।
পদার্থ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী তনিমা জান্নাত হাসি বলেন,”আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্যাম্পাস রাজনীতিকে খুব একটা পছন্দ করি না।তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েও একটা ছাত্রী প্রতিনিধি দল প্রয়োজন।আমাদের মেয়েদেরও নানা সমস্যা থাকে যা সরাসরি প্রশাসনের কাছে বলতে পারি না।আমাদের হলে প্রধান সমস্যা পানি নিয়ে। তাছাড়া কিছু কিছু ডিসিপ্লিনের হলের সিট নিয়ে বৈষম্য দেখা যায় এর একটা সমাধান দরকার।এজন্য একটি নির্দিষ্ট প্লাটফর্ম থাকলে মেয়েদের সুবিধা হয়”।
ইতিহাস ও সভ্যতা ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন বলেন,”আমাদের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় একটা ‘রাজনীতি মুক্ত ক্যাম্পাস’ এটা খুবই ভালো একটা দিক। কিন্তু ক্যাম্পাসে তো আমাদের সব ছাত্র-ছাত্রীরই কিছু দাবি-দাওয়া আছে। আমাদের অনেক সময় নানান ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এগুলোর সমাধান পাওয়ার অধিকার তো আমাদের আছে। এই সমস্যা গুলোর সমাধান এর জন্য আমরা তো সরাসরি প্রশাসনের কাছে যেতে পারি না তার জন্য একটা প্রতিনিধি দল প্রয়োজন। ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হোক সেটা আমরা চাই না,কিন্তু এমন একটা দল থাকুক যাদের কাছে আমরা আমাদের সমস্যা গুলো জানাতে পারব এবং সেই প্রতিনিধি দলের সাথে প্রশাসন সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত হয়ে আমাদের একটা সমাধান দিতে পারবে আশা করি”।
এ বিষয়ে ছাত্র বিষয়ক পরিচালক প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত বলেন, “খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে যেহেতু কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের কথা উল্লেখ নেই তাই এ বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই। তবে স্কুলের ডিন ও ডিসিপ্লিন প্রধানদের মিটিংয়ে শিক্ষার্থীদের ডিসিপ্লিন ভিত্তিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি আলোচনা হয়েছিল। যেখানে প্রত্যেক ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করার বিষয়টিও আলোচনা হয়।”
তিনি আরও বলেন, “এইরকম প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের কাজ করতে সুবিধা হবে। যারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিগুলো প্রশাসনের কাছে তুলে ধরবে।”
এ বিষয়ে মতামত জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম বলেন, “এই সংক্রান্ত আইন বিষয়ের আমার খুব একটা ধারণা নেই”।