
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ ঃ শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীতে সব ধরনের মাছ কমে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছে রূপগঞ্জের ৪০ হাজার জেলে। নদীতে পানি কমে গেছে। খাল-বিল শুকিয়ে গেছে। জালে মাছ নেই। হাতে কাজ নেই। ফলে দিন দিন ভারি হচ্ছে এনজিও আর মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের বোঝা। এ অবস্থায় খেয়ে না খেয়ে কোনমতে জীবন-যাপন করতে হচ্ছে উপজেলার ৪০ হাজার জেলের পরিবার বর্গকে।
রূপগঞ্জের তারাব-কাঞ্চন বাঁধের রূপসী এলাকার বাসিন্দা জেলে সোহেল মাঝি (৪৮)গত তিন মাস বেকার বসে আছেন।আলাপের শুরুতে বলেন,“তিন মাস ধইর্যা নদীতে মাছ নাই। ধার-দেনা কইর্যা খাইয়্যা না খাইয়্যা পোলাপাইন লইয়্যা কোন মতে বাইচ্যা আছি।”৬ জন সন্তান , স্ত্রী ও বুড়ো মা-বাবা রয়েছেন সাথে। শীতলক্ষ্যায় মাছ ধরেই এতগুলো মানুষের সংসার চালাতে হয় মাঝিকে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “নদীতে মাছ না থাকায় জাইল্যারা হিমশিম খাইত্যাছে উন্না (শুষ্ক মৌসুমে )আইলে দেনা কইর্যা ভাত খাইয়্যা বাঁচি। আর বাইর্যা (বর্ষা)আইলে মাছ ধইর্যা হেই দেনা শোধ করি।”
রূপগঞ্জের ৬ লাখ মানুষের মধ্যে ৪০ হাজার মানুষের একমাত্র পেশা বালু-শীতলক্ষ্যায় মাছ শিকার করা। শীতলক্ষ্যানদী পাড়ের বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধে বসবাসকারী জেলে পরিবারগুলোর হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ নির্ভর করে নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া না পাওয়ার ওপর।পর্যাপ্ত পরিমান মাছ পাওয়া না গেলে তাদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দিন।
সরজমিন পরিদর্শনে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব, রূপসী, গঙ্গানগর, মুড়াপাড়া, বানিয়াদি, কাঞ্চন, চনঁপাড়া, বড়ালু, ইছাখালী, হরিণা, মাঝিনা নদীরপাড়, নাওড়া, ইছাপুরা, পর্শ্বি, কামশাইর, নগরপাড়া, নয়ামাটি, দেইলপাড়া, পশ্চিমগাঁও এলাকার জেলেরা জানান, গত কার্তিক মাসের শেষ দিকে নদীতে মাছের পরিমান কমতে থাকে। প্রতি বছর শীত বেড়ে যাওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে নদীগুলো মাছ শূন্য হওয়ার পর সম্পূর্ন বেকার হয়ে পড়ে জেলেরা।এ সময় বিভিন্ন এনজিও’র ঋণ নিয়ে সংসার চালাতে হয়।
বালুনদী পাড়ের জেলে সুশীল জানান, শুকনো মৌসুমে বালু নদীতে পানি থাকে না।ঢাকার রামপুরা, মান্ডা, মাদারটেক, বাসাবো, মুগদা, এলাকার সোয়ারেজের ময়লা পানিতে মাছ মওে যায়। পানি কালচে বর্ণ ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ে। এই পানিতে মাছ ধরাতো দুরের কথা দুগন্ধে নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাসকরা যায় না।কোন সময় অল্প পরিমান মাছ পাওয়া গেলেও দুর্গন্ধে খাওয়া ও বিক্রি করা যায় না। সুশীল মাঝি আরো বলেন, এখন আগের মতো ধারদেনাও পাওয়া যাচ্ছে না। সামনের দিনগুলোতে পরিবার-পরিজনদেও খাওয়া-পড়ার ব্যবস্থা করাই কঠিন হবে।
নিতাই মাঝি নামে আরেক জন জেলে জানান, এক সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে অন্য সমিতির কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে।কখনো কখনো সমিতির লোক কিস্তির জন্যে এলে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাকতে হয়। অন্যদিকে ঘাটগুলোতে বিরাজ করছে সুনশান নীরবতা। মাছ ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে কপালে হাত দিয়ে বসে থাকে।এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য জেলেরা বিকল্প কর্মসংস্থান চাচ্ছেন। অভাব আর ধৈন্যের নাগপাশ থেকে রক্ষায় সরকারি ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্যকর ব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে আসার জোর দাবী জানিয়েছেন বালু-শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ের জেলে পরিবারগুলো।###