
জেলা প্রতিনিধি
গাইবান্ধার বীরাঙ্গনা রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় (গার্ড অব অনার) শেষ বিদায় জানানো হয়েছে। গার্ড অব অনার শেষে তাকে ধর্মীয় আচার অনুসারে নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরীদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) বিকেলে মহান মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের যুদ্ধাহত এই নারী মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা-গার্ড অব অনার দেন গাইবান্ধা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক। এসময় তার সঙ্গে সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) হাসান কবীরসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিনের বার্ধক্য ও শারীরিক নানা অসুস্থতায় শয্যাশায়ী থাকার পর গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে নিজ বাড়ি উপজেলার উত্তরপাড়ায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৮৪ বছর বয়সী এ মহিয়সী নারী।
রাজকুমারী রবিদাস ফুলমতি ওই এলাকার মৃত কুশিরাম সরকার ফসিয়ার স্ত্রী। দাম্পত্য জীবনে চার ছেলে ও এক মেয়ের জননী ছিলেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আশরাফুল হক গার্ড অব অনারের বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন বা অবদান রেখেছেন তারা এ দেশের সূর্য সন্তান। তাদের আত্মত্যাগ-অবদান অবিস্মরণীয়। যুদ্ধাহত ফুলমতিকে পরবর্তী সময়ে বীরাঙ্গনার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় নিয়ম অনুসারে তাকে বিকেল ৩টার দিকে গার্ড অব অনার (সম্মাননা) দেওয়া হয়। তিনি হিন্দু ধর্মের ছিলেন, পরবর্তী ধর্মীয় আচার পালন করবে তার পরিবার।
ফুলমতির ছেলে মনিরাজ কুমার রবিদাস জানান, ফুলমতি দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত ও নানা অসুস্থতা ভুগছিলেন। তারপর প্রায় দুই বছর আগে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তার ডান হাত-পা অবশ হয়ে যায়। তখন থেকে শয্যাশায়ী ছিলেন। এসবের মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর নিজ বাড়িতে মারা যান। পরে আজ বিকেলে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান (গার্ড অব অর্নার) শেষে নিজ বাড়ির উঠানে পূর্বসূরীদের পাশে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালে তার স্বামী কুশিরাম সরকার ফসিয়া মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের নিয়ে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থায় জীবনযাপন করেছেন এই বীরাঙ্গানা ফুলমতি। তিনি কখনও কারো কাছে সাহায্যের হাত পাতেননি।
সূত্র জানায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ফুলমতিদের বাড়িতে প্রবেশ করে ফুলমতির ওপর নির্যাতন চালায়। সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতির দীর্ঘ ৪৫ বছর পরে ২০১৬ সালের মার্চ মাসে বীরাঙ্গনার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পান যুদ্ধাহত ফুলমতি।
সাদুল্লাপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী বলেন, সংগ্রামী নারী ফুলমতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছেন। তিনি কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কারো কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতেননি।
আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ফুলমতির ত্যাগ ও নির্যাতনের স্বীকৃতি পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেক চেষ্টা ও আবেদনের পর ২০১৬ সালে তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
গাইবান্ধা প্রেসক্লাবের সভাপতি, কলেজ শিক্ষক ও সংগঠক অমিতাভ দাস হিমুন বলেন, ফুলমতির রাষ্ট্রীয় খেতাব পেতে অনেক লেখালেখি হয়েছে। অনেক কাছ থেকে তার আত্মত্যাগের কথা শুনেছি। ফুলমতি মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস। যা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ফুলমতির স্মৃতি সংরক্ষণে সমাধীস্থলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা প্রয়োজন এবং অত্যন্ত জরুরি।