
লোহাগড়া (নড়াইল) প্রতিনিধি:
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ছয় হাজার একর ফসলি জমি ও হাজারো পরিবারের বসতভিটা প্রতি বছর মধুমতী নদীর পানিতে প্লাবিত হচ্ছে। এ দুর্ভোগ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও সাত বছরেও কাজ শেষ হয়নি। জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়হীনতা এবং ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, কয়েক দশক ধরে মধুমতী নদীর ভাঙনে এলাকার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ঢুকে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত ছয় হাজার একর ফসলি জমি, পাশাপাশি পানিতে তলিয়ে যায় বহু বাড়িঘর।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় ২০১৯ সালে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কোটাকোল থেকে ঘাঘা চেয়ারম্যানের বাড়ি (ধলইতলা) পর্যন্ত ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩৪২ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের আপত্তি ও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ শুরু করে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও দুই দফা মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছু অংশে খননকাজ ছাড়া দৃশ্যমান অগ্রগতি খুব একটা দেখা যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের জন্য ১৬১ জন ভূমি মালিকের জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪ জন ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন। অন্যদিকে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রায় ৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রামের ফসলি জমি ও বসতভিটা রক্ষায় দ্রুত বেড়িবাঁধের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই কাজ করতে দেবেন না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএ ইউবি জে বি-এর ব্যবস্থাপক মো. মিলন আলী বলেন, “বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ নিয়ে আমরা বেশ বিপাকে আছি। এখনো পানি উন্নয়ন বোর্ড পুরো জমি আমাদের বুঝিয়ে দিতে পারেনি। কাজ করতে গেলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। তারা বলছেন, জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত কাজ করতে দেবেন না। পুরো জমি বুঝিয়ে দেওয়া হলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।”
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, “প্রকল্পটি ২০১৯ সালে অনুমোদন পেলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২২ সাল পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি। ২০২৩ সাল থেকে কাজ শুরু করা হলেও স্থানীয়দের বাধার কারণে ঠিকাদার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারছেন না। জেলা প্রশাসন কয়েক দফায় জমি চিহ্নিত করে দিলেও পরে স্থানীয়রা সেই চিহ্ন সরিয়ে ফেলছেন। অধিগ্রহণ জটিলতা নিরসন হলে দ্রুত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।”
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হোসনে আরা তান্নি। তিনি বলেন, “জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার লাল পতাকা দিয়ে প্রকল্পের জমি চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৪ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ক্ষতিপূরণের চেক পেয়েছেন। বাকিদেরও আবেদন করতে বলা হয়েছে। আবেদন পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।”
এদিকে চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। দ্রুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না হলে আসন্ন মৌসুমে আবারও ফসলি জমি ও বসতভিটা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।