
মোঃ আসাদুজ্জামান আসাদ
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গার উপজেলার উপজেলার নওদা বন্ডবিল গ্রামের সজিব আহম্মেদকে ইতালি পাঠাবেন বলে তার বাবা শহীদুল ইসলাম ১১ মাস আগে একই উপজেলার বেলগাছী গ্রামের ঠান্টুর ছেলে জীমের নিকট প্রথমে ১০ লাখ টাকা নগদ তুলে দেন। মাস ছয়েক আগে সজিব আহম্মেদ যাত্রা করেন। কিন্তু তার স্বপ্নযাত্রা সফল হয়নি। এখন তিনিসহ লিবিয়ায় জিম্মি অবস্থায় আছেন একই এলাকার ২৬ জন। তাদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করে পরিবারের কাছে থেকে মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, চক্রের সদস্যরা বাড়িতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে ১০-১৫ লাখ টাকা করে দাবি করছেন। অন্যথায় তাদের হত্যা করে লাশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হচ্ছে।ভুক্তভোগীরা হলেন- আলমডাঙ্গা উপজেলার হাউসপুর গ্রামের মামুনুর রশিদ, খেজুরতলা গ্রামের মিঠুন, তুহিন হক, তিতাস, জুয়েল রানা, হাসিবুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, বকুল হোসেন, নয়ন হক, আবু সাঈদ, জুনায়েদ হাসান প্লাবন, আবু জাফর, সাগর আলী, মিল্টন আলী, মোশারফ আলী, বিপুল হোসেন, নিশান মিয়া, আব্দুল্লাহ জাহিদ, একই উপজেলার পৌর এলাকার গোবিন্দপুরের সজিব হোসেন, হৃদয় আহমেদ টিটন, জহুরুলনগরের সবুজ আলী, কাবিলনগর গ্রামের বিপ্লব হোসেন, ঘোলদাড়ি গ্রামের সনজিত কুমার ও কেশবপুর গ্রামের মামুন আলী। নির্যাতিতদের পরিবার ও স্বজনরা বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১২টায় চুয়াডাঙ্গা প্রেসক্লাবে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে নির্যাতন ও টাকা দাবির বর্ণনা দেন।
ভুক্তভোগী আলমডাঙ্গা ফরিদপুর গ্রামের হারুন জানান, আমার মামাতো ভাই আলমডাঙ্গা উপজেলার নওদা বন্ডবিল গ্রামের শহীদুল ইসলামের ছেলে সজিব আহম্মেদকে ইতালিতে ভালো বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন একই উপজেলার বেলগাছী গ্রামের জান্টু মেম্বারের ছেলে লিবিয়া প্রবাসী সাগর। সে মোতাবেক আমাদের পরিবারের সদস্যরা আলোচনা করে সাগরের পিতা জান্টু মেম্বার, সাগরের চাচাতো ভাই বেলগাছী গ্রামের ঠান্টুর ছেলে জীমের নিকট প্রথমে ১০ লাখ টাকা নগদ দেয়া হয়। ওই সময় তাদের সাথে কথা হয় কাগজপত্র রেডি হলে হলে বাকী টাকা পরিশোধ করা হবে। ফেব্রুয়ারি মাসে জান্টু মেম্বার ও জীম আমার মামাতো ভাই সজিব আহাম্মেদের লিবিয়া যাওয়ার কাগজপত্র আমাদের কাছে দেন। ওই সময় তাদের কাছে জানতে চাওয়া হয় ইতালির কাগজপত্র না দিয়ে লিবিয়ায় যাওয়ার কাগজপত্র কেন? জীব ও জান্টু মেম্বার জানান, প্রথমে তাকে লিবিয়া নিতে হবে। এরপর লিবিয়া থেকে ইতালি নেয়া হবে। আমরা তাদের কথায় সরল বিশ্বাসে সেই সময় আরও ৩ লাখ টাকা দিই। বাকী ২ লাখ টাকা ইতালি পৌঁছানোর পর দেয়া হবে বলে জানানো হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে লিবিয়ায় পৌঁছানোর মাঝপথে জীম আরও ২ লাখ দাবি করেন। জীম জানান, এখনই ২ লাখ টাকা না দিলে সজিবকে ইতালি পাঠানো সম্ভব না। আমরা উপায়ান্তর না পেয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে ধার-কর্জ করে আরও ২ লাখ টাকা জীমের হাতে তুলে দিই। কয়েকদিন পর ভিডিও কলের মাধ্যমে লিবিয়ার প্রবাসী জান্টু মেম্বারের ছেলে সাগর আমাদের ভিডিও কলের মাধ্যমে জানান, আরও ১০ লাখ টাকা দিতে হবে তা না হলে সজিবের হাত পায়ের নোখ উপড়ে ফেলা হবে। ভিডিও কলে সজীবের কাছে নির্যাতনের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমরা অবগত হই। এমতাবস্থায় আমরা উপায় না পেয়ে জীমের হাতে বিভিন্ন সময়ে আরও নগদ ৭ লাখ টাকা তুলে দিই। এখনও লিবিয়া থেকে সাগর বিভিন্ন সময় ফোনের মাধ্যমে আরও টাকার দাবি করে জানিয়েছেন, ‘তোদের ছেলেকে বাঁচাতে চাইলে আরও টাকা দিতে হবে।’একই অভিযোগ খেজুরতলা গ্রামের জুয়েল রানার স্ত্রী পলি খাতুনের। তিনি জানান, আমার স্বামী গ্রামে কৃষি কাজ করতো। তাকে ইতালিতে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ১৫ লাখ টাকা দাবি করে লিবিয়া প্রবাসী সাগর, তার চাচাতো ভাই জীম ও সাগরের পিতা জান্টু মেম্বার। ফেরুয়ারি মাসে লিবিয়া পৌঁছানো পর তিনি এখন জিম্মি। প্রতিদিন তাদের খেতে দেয়া হয় না। মারধর করে আর মোটা অঙ্কের টাকা চায়।আলমডাঙ্গা উপাজেলার চরযাদবপুর গ্রামে সাবিনা খাতুন নামে আরেক নারী জানান, আমার একমাত্র ভাই একই উপজেলার খেজুরতলা গ্রামের আব্দুল্লাহ জাহিদ দিপু। পড়াশোনা করেছে এইচএসসি পর্যন্ত। ইতালিতে ভালো বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে আমাদের নিকট ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন। আমি প্রথমে বিভিন্ন এনজিও থেকে আমার স্বামীকে গ্যারান্টার রেখে ৭ লাখ টাকা লোন এবং আত্মীয় স্বজনের কাছ থেকে আরও ৩ লাখ টাকা নিয়ে মোট ১০ লাখ টাকা জোগাড় করি। প্রথম সেই ১০ লাখ টাকা জীম, জান্টু মেম্বারের হাতে তুলে দিই। টাকা দেয়ার সময় তাদেরকে আমি জানাই, আমার এই ভাই ছাড়া আপনজন কেউ নেই। সুতরাং আপনারা যদি ভালোভাবে ইতালি নিয়ে যেতে পারেন তাহলে টাকা নেন। না হলে আমার ভাইকে আমি পাঠাবো না। ওই সময় অভিযুক্তরা আমাকে আশ্বস্ত করেন করে বলেন তোমাদের সাথে কথা হয়েছে ১৫ লাখ টাকার। এখন ১০ লাখ টাকা দাও বাকী ৫ লাখ টাকা তোমার ভাই সেখানে পৌঁছানোর পর দিতে হবে। তোমার ভাই সেখানে গিয়ে মাসে ১ লাখ টাকা বেতন পাবে। যেদিন বাংলাদেশ থেকে আমার ভাই সেখানে যাওয়ার উদ্দেশে রওনা দেয় ওইদিনই আমার কাছে বাকী ৫ লাখ টাকা দাবি করে জীম। কিছুদিন পর আমার ভাই আমার মোবাইলে কল করে নির্যাতনের বর্ণনা দেয়। ওই সময় সে জানায় আপা আমি আজ দুইদিন যাবত কিছু খাইনি। এরা আমাকে অকথ্য নির্যাতন করছে। কিছু খেতে দিচ্ছে না। তখন আমি আমার ভাইয়ের কথা চিন্তা করে প্রায়ই ৫ হাজার থেকে শুরু করে যখন যা পারি সাগর দালালকে দিতে থাকি। এর কিছুদিন পর আবার আমার কাছে ফোন দিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করে। যদি টাকা না দিই তবে আমার ভাইকে মেরে ফেলা হবে বলে জানানো হয়। আমি হতভম্ব হয়ে আবারও এনজিও থেকে ৩ লাখ ও বাড়ির জমি বিক্রি করে ২ লাখ মোট ৫ লাখ টাকা জীমের হাতে তুলে দিই। নির্যাতন এখনও থামেনি। প্রায়ই আমার কাছে ফোন দিয়ে আরও টাকা দাবি করে। বর্তমানে আমার আর কিছু নেই। এখন শ্বশুরবাড়িতে আমাকে নানা কথা শুনতে হচ্ছে। মরণ ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। গত ৪-৫ দিন ধরে আমার কাছে দালাল সাগর প্রতিনিয়ত ফোন দিচ্ছে ২ ঘণ্টার মধ্যে ২২ লাখ টাকা দিতে হবে। জীম ও জীবন প্রায় প্রতিদিনই আমার কাছে এসে টাকা চাচ্ছে।
নাগদাহ ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড মেম্বার রকিবুল জানান, বেলগাছী ইউনিয়নের জান্টু মেম্বারের ছেলে লিবিয়া প্রবাসী দালাল সাগরের প্রলোভনে পড়ে তার পিতা জান্টু, ভাই জীবন, চাচাতো ভাই জীম, চাচা ঠান্টু, চাচী স্কুল শিক্ষিকা বেদেনা, সাগরের মা আমেনাসহ বিভিন্ন নিকটজনের মাধ্যমে এখানে উপস্থিত ভুক্তভোগীরা কারও ভাই, কারো ছেলেকে ইতালি পাঠানোর জন্য ১৫ লাখ করে টাকা দেন। বর্তমানে আমি এদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি বলে অভিযুক্তরা আলমডাঙ্গায় আমাকে মিথ্যা দোষারোপ করে সাংবাদিক সম্মেলন করেছে। আমি জনপ্রতিনিধি হিসেবে ভুক্তভোগীদের ন্যায় বিচারের দাবি জানাচ্ছি।আলমডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান বলেন, অবৈধ প্রক্রিয়ায় ইতালি পাঠানোর কথা বলে সাগর ও জীবনের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ আছে। ভুক্তভোগী কয়েকজন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আনিসুজ্জামান লালন বলেন, আলমডাঙ্গার বেলগাছী গ্রামের একটি চক্র তাদেরকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে টাকা আদায়ের জন্য বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছে মর্মে সত্যতা পেয়েছি। এ ব্যাপারে আলমডাঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযানসহ মূল ঘটনা উদঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।উল্লেখ্য, গত ১১ ডিসেম্বর মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ভুক্তভোগী পরিবারের ২২ ব্যক্তির পক্ষে একই উপজেলার খেজুরতলা গ্রামের মৃত মঙ্গল মন্ডলের ছেলে রেজাউল হক বাদি হয়ে আলমডাঙ্গা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে একই উপজেলার বেলগাছী গ্রামের ঠান্ডুর ছেলে জীম, জান্টুর ছেলে জীবন ও সাগর, মৃত ইয়াছিন মালিথার ছেলে জান্টু ও তার স্ত্রী আমেনা খাতুন, মৃত ইয়াছিন মালিথার ছেলে ঠান্টু ও তার স্ত্রী বেলগাছী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের স্কুল শিক্ষিকা বেদেনা খাতুনকে।