
টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি
রাহিদ রানা দিনটি ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পরিচিত। সেই দিনে কামরুজ্জামান নিজের সংগ্রহ আর বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ১০০টি বই নিয়ে তার বাড়ির একটি কক্ষে চালু করেন পাঠাগার। বর্তমানে দুই হাজারের অধিক সংখ্যক বইয়ের সমৃদ্ধ পাঠাগারে নিয়মিত পাঠক সদস্য সংখ্যা ২১৯ জন এবং অণুপাঠাগারের কয়েক হাজার পাঠক রয়েছেন। পাঠাগারটিতে বই পড়া, জ্ঞান আহরণ তথা নূতন তথ্য অনুসন্ধানের জন্য প্রতিনিয়তই পাঠকদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল বয়সের নারী-পুরুষ এখানে এসে জ্ঞানের অতল সমুদ্রে অবগাহন করতে পারেন। আবার কেউ চাইলে নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে পাঠাগারের সদস্য হতে পারেন। কোন পাঠক ইচ্ছা করলে পাঠাগারে বসে বই পড়তে পারেন আবার চাইলে বাড়িতে নিয়েও পড়তে পারেন।
মাধ্যমিক পাসের পর গ্রাম ছেড়ে টাঙ্গাইল শহরে চলে যান কামরুজ্জামান। সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে অপরাধ তত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগে সম্মান শ্রেণিতে পড়ার সময় নিজ গ্রামে গড়ে তোলেন পাঠাগার। নাম দেন ‘বাতিঘর’। সেই বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার এখন আলো ছড়াচ্ছে গ্রামের ঘরে ঘরে।
কামরুজ্জামানের বাড়ি টাঙ্গাইল সদর উপজেলার মগড়া ইউনিয়নের চৌরাকররা গ্রামে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরি করছেন বাংলাদেশ পুলিশে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে। কর্মরত আছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তে।
পাঠাগারের কার্যক্রম পরিচালনা করে গ্রামেরই কলেজপড়ুয়া কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের একজন সীমা আক্তার। সে লায়ন নজরুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজের স্নাতকের পরীক্ষার্থী। সে জানায়, বৃহস্পতিবার ছাড়া প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকে। এ সময়ের মধ্যে বই দেওয়া-নেওয়া চলে। একটি বই ১৫ দিনের জন্য দেওয়া হয়। কারও পাঠাগারে আসতে অসুবিধা হলে ফোন করলেও বই পৌঁছে দেওয়া হয়।
পাঠাগারে কথা হয় মগড়া উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে। তার ভাষ্য, এই পাঠাগার হওয়ায় তাদের বই পড়ার খুব সুবিধা হয়েছে। চাইলেই বই নিয়ে আসতে পারে। গ্রামের মধ্যবয়সী ব্যবসায়ী ছানোয়ার হোসেন জানান, অবসর সময়ে তাঁর বই পড়ার অভ্যাস। তাই এই পাঠাগারের সদস্য হয়েছেন। এখান থেকে বই নিয়ে নিয়মিত পড়েন।
পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কামরুজ্জামানের বাবা মো. শাহজাহান খবরের কাগজকে জানান, প্রথমে যখন কামরুজ্জামান পাঠাগারটি স্থাপন করে, তখন মনে হতো পাগলামি করছে। কিন্তু কিছুদিন যেতেই দেখতে পেলেন, এটি খুব ভালো উদ্যোগ। তাই তিনি বাড়ির ঘরটি ব্যবহার করতে দিচ্ছেন।
কামরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, অনেক মানুষ আছেন, যারা বই পড়তে ভালোবাসেন তবে নিয়মিত বই কিনে পড়ার সামর্থ নেই তাদের জন্য সহজে বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। তিনি না থাকলেও পাঠাগারটি যাতে টিকে থাকে, সে জন্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। পাঠাগার পরিচালনার জন্য গ্রামের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমন্বয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি করে দিয়েছেন। তাঁদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছে এই পাঠাগার। পাঠাগারের জন্য গ্রামে একটি স্থায়ী জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারপর সেখানে নিজস্ব ভবন করার স্বপ্ন দেখছেন কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় পাঠাগারটি একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে। নিজস্ব ভবন এবং দেশ–বিদেশের বইপত্রে সমৃদ্ধ একটি পাঠাগার নিশ্চয় আমরা গড়ে তুলতে পারব।’
পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহবুব হাসান জানান, “আশেপাশে কোনো পাঠাগার না থাকায় বই পড়তে হলে আমাদেরকে বার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জেলা সরাকারি গ্রন্থাগারে যেতে হতো। যা অনেক কষ্টসাধ্য ও দূরহ ছিল। তাই ইচ্ছা থাকলেও সবসময় সুযোগ পেতাম না। এই পাঠাগার প্রাতিষ্ঠার ফলে আমরা খুব সহজে বই পড়ার সুযোগ পেয়ে অনেক উপকৃত হচ্ছি, তবে বইয়ের সংখ্যা এবং আসবাবপত্র আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।”
চৌধুরীমালঞ্চ উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জনাব আনিসুর বলেন, “পাঠাগারটি সাধারণ মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরীতে ভূমিকা রাখছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের বই পড়ে শিক্ষার্থীরা জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করছে যা তাদের ভবিষ্যৎ আলোকিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই পাঠাগারটির উন্নয়নে সমাজের শিক্ষানুরাগী ও বিত্তবানদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।”
পাঠকের হাতের নাগালে বই পৌছে দিতে এবং অবসর সময়কে ফলপ্রসূ করতে সেলুন অণুপাঠাগার, বাস-স্ট্যান্ড অণু-পাঠাগার, স্টেশন অণুপাঠাগারসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন কামরুজ্জামান।
বাস-স্ট্যান্ড অণুপাঠাগার
টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিকদার। পরবর্তী বাস ১ ঘণ্টা পরে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হবে। তাই এ সময়টা তাকে অপেক্ষা করতে হবে বাস কাউন্টারে। এই সময়টা মোবাইল ফোনে অথবা অন্যকোনভাবে নষ্ট না করে যদি বই পড়ে কাটানো যায় তাহলে কেমন হয়? অপেক্ষমান যাত্রীদের বই পড়ার এমন সুবর্ণ সুযোগ করে দিতে বাতিঘর আদর্শ পাঠাাগার এর উদ্যোগে টাঙ্গাইল শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ডে কয়েকটি বাস কাউন্টারে অণু-পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। বাসের জন্য অপেক্ষা করে এখন আর যাত্রীদের সময় নষ্ট হবেনা বরং বই পড়েই কেটে যাবে মূল্যবান সময়। এ উদ্যোগে খুশি হয়েছেন বাস যাত্রীরা। সড়েজমিনে টাঙ্গাইল নতুন বাস স্ট্যান্ডের সকাল-সন্ধ্যা বাসকাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, দেয়ালে সাটানো ছোট বুকসেলফে বিভিন্ন ধরনের বই রাখা আছে। যেখান থেকে অপেক্ষমান যাত্রীরা তাদের পছন্দমত বই নিয়ে পড়ে সময় কাটাচ্ছেন এবং চলে যাওয়ার সময় বুকসেলফে বই রেখে যাচ্ছেন। কথা হয় অপেক্ষমাণ আরেক যাত্রী খন্দকার মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, চাকুরির সুবাধে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় প্রায়ই যাতায়াত করতে হয়। অনেক সময় বাসের জন্য অপেক্ষ করি। এসময়টা বই পড়ার ব্যবস্থা একটা চমৎকার উদ্যোগ। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে বই পড়ার বিকল্প নেই।
সেলুন অণুপাঠাগার
সেলুনে চুল কাটাতে গিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়নি এমন মানুষ পাওয়া দায়। এই অলস সময় যদি বই পড়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় তাহলে নিশ্চয়ই মন্দ হয় না। এ ভাবনা থেকেই টাঙ্গাইলের কামরুজ্জামান তার এলাকার কয়েকটি সেলুনে বিনামূল্যে বই পড়ার কর্মসূচি চালু করেন। বই পড়ার এ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে সেলুন অণুপাঠাগার। টাঙ্গাইল সদর উপজেলার কুইজবাড়ী, আয়নাপুর, চৌরাকররা, নন্দবালা, মগড়া বাজার ও কালিহাতী উপজেলার পালিমা বাজারে মোট ১০টি সেলুন অণুপাঠাগার চালু করেছেন। কুইজবাড়ী বাজারের গোবিন্দ হেয়ার ড্রেসার নামের একটি সেলুনে গিয়ে দেখা যায়, সেলুনের এক কোনায় ২০-২৫টি বই সাজিয়ে রাখা হয়েছে। চুল কাটপাতে এসে যারা অপেক্ষমাণ, তারা সবাই বসে বই পড়ছেন। সেলুনের স্বত্বাধিকারী গোবিন্দ চন্দ দাস জানান, অনেকদিন ধরে তার দোকানে বই পড়ার এ কার্যক্রম চালু করা হয়ছে। এরপর থেকে তার দোকানে সেবা নিতে আসা লোকজন অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ধৈর্য হারেয়ে ফেলেন না। কারণ, তারা বই পড়ে সময় কাটিয়ে দিতে পারেন। চুল কাটাতে আসা মোঃ রিপন মিয়া জানান, চুল কাটাতে এসে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলেও এখন আর বিরক্ত লাগেনা। অবসর সময়ে এখানে অনেক ছাত্রও বই পড়তে আসেন।
স্টেশন অণুপাঠাগার
যাতায়াতের পথে ট্রেনের জন্য স্টেশনে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। এ সময় যাত্রীরা গল্পগুজব করে অলস সময় পার করে দেন। স্টেশনে বই পড়ার সুযোগ থাকলে যাত্রীরা বই পড়ে আনন্দে সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে মনোজগতকে পরিশুদ্ধ করতে পারবেন। এ ভাবনা থেকেই বাতিঘর আদর্শ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা মোঃ কামরুজ্জামান টাঙ্গাইল রেল স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের জন্য স্টেশন অণুপাঠাগার তুলেছেন। স্টেশনের মূল প্ল্যাটফর্মে কাঠের একটি বুকসেলফ স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে সাজানো বই থেকে যাত্রীরা তাদের পছন্দের বই নিয়ে পড়ে আবার জমা দেন। টাঙ্গাইল থেকে ঢাকাগামী সিল্কসিটি ট্রেনের অপেক্ষমাণ যাত্রী মোঃ রাকিব হোসেন বলেন, ‘এটি খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ট্রেনের জন্য বিভিন্ন সময় স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয়। এখানে সুন্দর পরিবেশ রয়েছে বই পড়ার। অপেক্ষার সময়টুকু এখন আমরা বই পড়ে আনন্দের মধ্যে কাটাতে পরছি।’
বৃক্ষরোপণ ও সামাজিক কার্যক্রম
প্রতিবছর পাঠাগারের উদ্যোগে বৃক্ষরোপন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বজ্রপাত প্রতিরোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কিছুদিন আগে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দু’ধারে প্রায় সাত শতাধিক তালবীজ বপন করেন এই পাঠাগারের সদস্যরা। স্বেচ্ছাশ্রমে গ্রামীণ রাস্তা মেরামতসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতা করে থাকেন তারা। প্রতিবছর শীতার্ত অসহার মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণসহ বিভিন্ন জনসচেতনামূলক কার্যক্রম পরিচলনা করা হয়ে থাকে।
পাঠাকদের জন্য নানা আয়োজন
বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনসহ পাঠক মেলা, বই বিনিময় উৎসব, দেশীয় ফল উৎসব, শিশু-কিশোরদের জন্য চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি ও কুইজ প্রতিযোগিতা, খেলধুলা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও রক্তদান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়ে থাকে। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের কৃষিকাজে উদ্বুদ্ধ করেতে সম্প্রতি পাঠাগারের পক্ষ থেকে এলকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মাঝে শীতকালীন শাকসবজির বীজ ও চারা বিতরণ করা হয়।
গ্রামাঞ্চলে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে বই পড়া আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কামরুজ্জামান তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন নানা সম্মাননা। প্রথমআলো বন্ধুসভা সম্মাননা-২০২১, পাঠশালা ইমার্জিং লিডার অ্যাওয়ার্ড-২০২২, ইস্টিশন পাঠাগার সম্মাননা-২০২৩, আলোর ফেরী পাঠাগার ডিজিটালাইজেশন সম্মাননা, বাংলাদেশ বুকওয়ার্মস এসোসিয়েশন বিশেষ সম্মাননা-২০২৪ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
এছাড়াও সম্প্রতি পাঠাগারের সদস্য ও পাঠক ফাওজিয়াহ হক জিনাত জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় স্কুল পর্যায়ে দেশ সেরা নির্বাচিত হয়েছেন।
কামরুজ্জামান বলেন, প্রযুক্তির আসক্তি কাটিয়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে পাঠাভ্যাস তৈরি তথা সামাজিক-মানবিক কাজে তাদেরকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিনিয়ত আমাদের ছুটে চলা। আমাদের এ কার্যক্রম পুরো জেলায় ছড়িয়ে দিতে চাই। একদিন এমন কার্যক্রম সারা দেশে ছড়িয়ে পরবে সেটাই প্রত্যাশা।