
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
একসময় গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন পানির চাহিদা মেটানোর অন্যতম ভরসা ছিল পাটের কূয়া। বিশেষ করে আধুনিক পানির ব্যবস্থা সহজলভ্য হওয়ার আগে গ্রামের অনেক বাড়িতেই ছিল এমন কূয়া। সকাল-বিকেল কলসি, বালতি কিংবা ঘড়া হাতে কূয়া থেকে পানি সংগ্রহ করা ছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত দৃশ্য। সময়ের সঙ্গে টিউবওয়েল, বৈদ্যুতিক মোটর ও সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবহার বাড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী এসব কূয়া।
শুধু ডিমলা নয়, দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলেও কমবেশি প্রচলিত ছিল পাটের কূয়া। কয়েক দশক আগেও ডিমলার বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে এমন কূয়া দেখা যেত। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমেও এসব কূয়ার পানি তুলনামূলক ঠান্ডা থাকত। অনেক পরিবার পান করা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন নানা কাজে এই পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
যেভাবে তৈরি হতো পাটের কূয়া: বাছাই করা মাটি দিয়ে প্রথমে গোলাকার রিং বা স্লাব তৈরি করা হতো। এরপর সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে শক্ত করা হতো। নির্ধারিত জায়গায় কূয়া খননের সময় মাটির গভীর থেকে একটির পর একটি রিং বা স্লাব সারিবদ্ধভাবে বসানো হতো। মাটি খননের সঙ্গে সঙ্গে রিংগুলো ধীরে ধীরে আরও গভীরে নামানো হতো। এভাবে রিংগুলো পানির স্তর পর্যন্ত পৌঁছালে কূয়ার ভেতরে পানি জমা হতো। মাটির ওপরের অংশেও কয়েকটি রিং তুলে রাখা হতো। কূয়ার বাইরের অংশে বাঁশ দিয়ে বোনা কাঠামো তৈরি করে সেটিকে ঘিরে রাখা হতো। পুরোনো এই নির্মাণপদ্ধতিই পাটের কূয়াকে অন্য সাধারণ কূয়া থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে।
পাটের কূয়ার পানি শুধু পান করার জন্যই নয়, গোসল, কাপড়চোপড় ও বাসনপত্র ধোয়া, রান্নাবান্না এবং গবাদিপশুর পরিচর্যাসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করা হতো। ফলে একটি কূয়া ছিল একটি পরিবার কিংবা কয়েকটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কূয়াকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল সামাজিক যোগাযোগেরও একটি পরিবেশ। পানি সংগ্রহ করতে এসে নারীরা পারিবারিক ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। বিকেলে সেখানে বসত প্রবীণদের আড্ডা। শিশু-কিশোরদেরও ছিল বিচরণ। ফলে কূয়াপাড় হয়ে উঠেছিল গ্রামীণ জীবনের পরিচিত ও প্রাণবন্ত একটি স্থান।
ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ গয়াবাড়ি গ্রামের মাস্টারপাড়ায় এখনো টিকে আছে এমন একটি কূয়া। আধুনিক পানির ব্যবস্থার ভিড়ে এটি এখন আর নিয়মিত ব্যবহৃত হয় না। তবে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা কূয়াটি বহন করছে গ্রামীণ জীবনের পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, কয়েক দশক আগেও ডিমলার গ্রামাঞ্চলের বহু বাড়িতে এমন কূয়া ছিল। তখন টিউবওয়েল, বৈদ্যুতিক মোটর কিংবা সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবহার এতটা সহজলভ্য ছিল না। তাই কূয়াই ছিল অনেক পরিবারের অন্যতম প্রধান পানির উৎস।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই চিত্র। বাড়ি বাড়ি টিউবওয়েল স্থাপন এবং বিদ্যুতের সুবিধা বাড়ার ফলে বৈদ্যুতিক মোটর ও সাবমার্সিবল পাম্পের ব্যবহার সহজলভ্য হয়। এতে কূয়ার ওপর মানুষের নির্ভরতা কমতে থাকে। একপর্যায়ে অনেক কূয়া পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। পরিচর্যার অভাবে কোনোটি ভরাট হয়ে গেছে, আবার কোনোটি ঢেকে গেছে ঝোপঝাড় ও আগাছায়।
দক্ষিণ গয়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা ও সাংবাদিক মামুনুর রশিদ বলেন, “একসময় পাটের কূয়া ছিল গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনের সঙ্গে জড়িত। পানি সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে এর ব্যবহার ছিল। এখন আধুনিক পানির ব্যবস্থার কারণে সেই প্রয়োজন নেই। তবে টিকে থাকা কূয়াগুলো সংরক্ষণ করা গেলে গ্রামের পুরোনো জীবনযাত্রার স্মৃতি ধরে রাখা সম্ভব।”
একই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দিন বলেন, “আমাদের শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই কূয়াকে ঘিরে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমেও কূয়ার পানি ছিল ঠান্ডা। গ্রামের মানুষ এখান থেকে পানি সংগ্রহ করত, আর কূয়াপাড় ছিল পরিচিত একটি জায়গা। এখন টিউবওয়েল ও পাম্পের কারণে কূয়ার ব্যবহার নেই বললেই চলে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, পাটের কূয়া এখন শুধু পানি সংগ্রহের পুরোনো ব্যবস্থা নয়, এটি গ্রামীণ বাংলাদেশের অতীত জীবনযাপন ও স্থানীয় জলব্যবস্থাপনার একটি স্মারক। তাই টিকে থাকা কূয়াগুলোর অবস্থান, নির্মাণপদ্ধতি ও স্থানীয় ইতিহাস নথিভুক্ত করা জরুরি। পাশাপাশি দৃশ্যমান কূয়াগুলো পরিষ্কার-পরিচর্যা করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ জলব্যবস্থার এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে।