
একটা সময় ছিল যখন মোবাইল ফোন মানে শুধুই যোগাযোগের যন্ত্র। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন ছাড়া জীবন কল্পনা করা কঠিন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, দেশের ৭২ শতাংশ পরিবারে এখন অন্তত একটি স্মার্টফোন আছে। আর ৯৮.৯ শতাংশ খানায় মোবাইল ফোন ব্যবহার হয়। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা সবখানেই স্মার্টফোন। কিন্তু এই নির্ভরতাই ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে আসক্তিতে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘বিহেভিয়ারাল অ্যাডিকশন’। মাদকের মতোই এটি মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়। ফলে ব্যবহারকারী বারবার ফোনের দিকে ফেরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউ এইচ ও) একে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি এখন আর ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং নীরব মহামারির মতো সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।
বিবিএসের ‘তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) অ্যাক্সেস ও ব্যবহার’ জরিপ ২০২৪-২৫ অনুযায়ী ৭২% পরিবারে এক বা একাধিক স্মার্টফোন আছে,৭০% পরিবার অন্তত একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করে। ৬৫% মানুষের নিজস্ব মোবাইল ফোন আছে, ৪৭.২% মানুষ সরাসরি ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ৭৫% এর বেশি ব্যবহারকারী দিনে অন্তত একবার ইন্টারনেটে ঢোকেন। ৫২% পরিবারের ইন্টারনেট সংযোগ আছে, যা তিন মাস আগেও ছিল ৫০.৪%।
গ্রাম ও শহরের ব্যবধানও স্পষ্ট। শহরে ৬১.৬% পরিবারের ইন্টারনেট আছে, গ্রামে ৪৮.২%। ব্যক্তি পর্যায়ে শহরে ৬৮% এর বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও গ্রামে এই হার ৩৮% এর কম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ৬১.৩% এর স্মার্টফোন আসক্তির মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রা রয়েছে। তাদের গড় দৈনিক ব্যবহার ৫.২ ঘণ্টা। এর মধ্যে ৭০% সময় যায় সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের সমীক্ষা বলছে, হাসপাতালের বহির্বিভাগে আসা কিশোর রোগীদের ২৭% এর প্রধান অভিযোগ ‘অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারজনিত’ উদ্বেগ, মনোযোগহীনতা ও ঘুমের সমস্যা। মানসিক প্রতিবন্ধী হয়ে অনেক আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে।
বেসরকারি সংস্থা ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৮টি জেলার ১,৫০০ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করে। ফলাফল: ৪২% শিক্ষার্থী স্বীকার করেছে, পরীক্ষার আগের রাতেও তারা ৩ ঘণ্টার বেশি মোবাইল ব্যবহার করে। ৩৪% বলেছে, ফোন না থাকলে তাদের অস্থির লাগে, মেজাজ খারাপ হয়। এটাই আসক্তির বড় লক্ষণ।
এখন ৮-১০ হাজার টাকায় ভালো মানের স্মার্টফোন পাওয়া যায়। ভিডিও কল, ক্লাস, ফ্রিল্যান্সিং সব করা যায়। করোনার পর থেকে ক্লাস, কোচিং সব মোবাইলে। অভিভাবকরাও বাধ্য হয়ে কিনে দিয়েছেন। বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে মাঠ কমে যাওয়া, নিরাপত্তাহীনতার কারণে শহরের শিশুরা ঘরবন্দি।
ইউটিউব, টিকটক, ফ্রি ফায়ার হয়ে উঠেছে বিকল্প এছাড়াও কর্মজীবী বাবা-মা সন্তানকে শান্ত রাখতে হাতে ফোন তুলে দেন। রাত জেগে ফোন ব্যবহারে মেলাটোনিন হরমোন কমে যায়। ঢাকা মেডিকেলের শিশু বিভাগের তথ্য, গত ২ বছরে ঘুমের সমস্যা নিয়ে আসা ১০-১৬ বছর বয়সীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট বলছে, ২০২৪ সালে ১২-১৮ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যে ‘ড্রাই আই’ ও ‘মায়োপিয়া’ ৩০% বেড়েছে। ঘাড় ব্যথা নিয়ে ফিজিওথেরাপি সেন্টারে আসা কিশোরের সংখ্যাও বাড়ছে। রাতের খাবার টেবিলেও সবাই যার যার ফোনে। ‘বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম’-এর মতে, ৫৫% অভিভাবক স্বীকার করেছেন, সন্তানের সঙ্গে তাদের ‘কোয়ালিটি টাইম’ কমে গেছে।
পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট জানায়, ২০২৪ সালে কিশোর ভিকটিমের সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ এসেছে ৩,২০০টি। এর বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার।
ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, “খাবার টেবিল, পড়ার সময় নো-ফোন জোন করতে হবে। বাবা-মাকে আগে নিজের স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে।”
অনেক স্কুলে ক্লাসে ফোন নিষিদ্ধ। তবে টিফিন টাইমেও ফোন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং সপ্তাহে একদিন ‘ডিজিটাল ডিটক্স ডে’ চালু করা। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপ’ বিনামূল্যে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে। বিটিআরসি রাত ১০টার পর শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট গেম ও অ্যাপ বন্ধ রাখার নীতিমালা করতে পারে। প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক চর্চা বাড়াতে হবে।
স্মার্টফোন এখন জীবনের অংশ। কিন্তু ৭২% পরিবারে পৌঁছে যাওয়া এই যন্ত্র যখন আসক্তিতে রূপ নেয়, তখন তা মহামারির চেয়ে কম নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমস্যাটা আরও জটিল, কারণ এখানে সচেতনতা কম, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল। প্রযুক্তিকে আশীর্বাদ রাখতে হলে ব্যবহারে লাগাম টানতে হবে এখনই। নইলে স্ক্রিনের নীল আলোয় হারিয়ে যাবে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা।
মৃদুল হাসান
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।