
নাহিদা হাসান দীপা,রংপুর
বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণের চাপ দিন দিন বাড়ছে। রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কমাতে না পারায় সরকারকে প্রতি বছর বড় অঙ্কের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকারের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাজেট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই ঋণ নিতে হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ দশমিক ৪৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯ দশমিক ৪৯ লাখ কোটি টাকা, যা মোট সরকারি ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ। চার বছর আগেও এই বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় অর্ধেক। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় এখনো আন্তর্জাতিক ঝুঁকিসীমার মধ্যে থাকলেও রাজস্ব আয়ের তুলনায় ঋণের চাপ বাড়ছে। বর্তমানে সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাত প্রায় ৩৭ থেকে ৩৮ শতাংশ হলেও ঋণ পরিষেবার ব্যয় দ্রুত বাড়ায় বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে সরকারকে শুধু ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় করতে হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। এটি জাতীয় রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশেরও বেশি। অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আয়ের বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড.সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা গেলেও সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। তাই প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধির চেয়ে অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত করাকেই সরকার বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।আমরা চাই এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে, যেখানে সকল নাগরিকের জন্য থাকবে মানসম্মত জীবনযাত্রা এবং বৈষম্যহীন সুযোগ। সেই লক্ষ্যেই বাজেট পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বিদেশি মুদ্রার চাপ। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিজার্ভ কমে আসায় ঋণ পরিশোধ ও আমদানি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ট্যাক্স-টু-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়লে বাজেট ঘাটতি কমানো কঠিন হবে এবং ঋণনির্ভরতা আরও বাড়বে।
এদিকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় ভবিষ্যতে স্বল্প সুদের কনসেশনাল বৈদেশিক ঋণের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সুদের ঋণ নিতে হতে পারে, যা ঋণ পরিষেবা ব্যয় আরও বাড়াবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেট ঘাটতি ও বৈদেশিক ঋণ এখনই নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং ঋণ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর