
প্রীতম কান্তি গোপ, কুবি
মরুভূমির তপ্ত বালু থেকে বাংলার সবুজ শ্যামল প্রান্তর, কিংবা ইউরোপের ব্যস্ত শহর। পৃথিবীর মানচিত্র যেখানেই থমকে দাঁড়াক না কেন, রমজানের চাঁদ আকাশে উঁকি দিলেই বদলে যায় দৃশ্যপট। দীর্ঘ এক মাস আত্মসংযম ও ত্যাগের পর সূর্যাস্তের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ অর্থাৎ ইফতার যেন পৃথিবীর বুকে নেমে আসা এক স্বর্গীয় আনন্দ।
ইসলামের দেড় হাজার বছরের ইতিহাসে রমজান কেবল উপবাসের মাস নয় এটি সহমর্মিতার এক বিশাল পাঠশালা। প্রিয়নবী (সা.)-এর সেই অতি সাধারণ খেজুর আর পানির ইফতার আজ দেশ-কাল-পাত্রভেদে বিচিত্র সব স্বাদে পল্লবিত হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কীভাবে সাজানো হয় রমজানের এই পবিত্র দস্তরখান?
আরব উপদ্বীপ:
ইসলামের পুণ্যভূমি সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে রমজান আসে এক রাজকীয় গাম্ভীর্য নিয়ে। এখানকার ইফতারের মূল আকর্ষণ হলো ‘খাবসা’ যা চাল ও মাংসের এক সুগন্ধি যুগলবন্দি। তবে তাদের খাবারের টেবিলে পুষ্টির দিকে কড়া নজর রাখা হয়। বিভিন্ন রকমের স্যুপ, ‘তামিজ’ রুটি এবং আঙুর রসের বিশেষ শরবত ‘ভিমতো’ দিয়ে তারা প্রাণ জুড়ায়। আর মক্কা-মদিনার হারাইন শরিফে বিশ্বের দীর্ঘতম ইফতার দস্তরখানের দৃশ্য তো প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে এক অনন্য আবেগের নাম।
বাংলাদেশ:
বাঙালির ইফতার মানেই এক চিলতে স্মৃতিকাতরতা। পুরান ঢাকার চকবাজারের শাহী জিলাপি থেকে শুরু করে গ্রামের সাধারণ বাড়ির মুড়ি-ছোলা সবখানেই আছে এক প্রাণের টান। পেঁয়াজু, বেগুনি আর আলুর চপের সেই চিরচেনা সুবাস ছাড়া বাঙালির ইফতার যেন পূর্ণতা পায় না। এর সঙ্গে ইদানীং যুক্ত হয়েছে হালিম ও কাচ্চি বিরিয়ানির মতো রাজকীয় পদ। তবে দিনশেষে লেবুর শরবত বা আখের গুড়ের এক গ্লাস পানীয়ই সব ক্লান্তি ধুয়ে মুছে দেয়।
মিশর ও উত্তর আফ্রিকা:
মিশরের রমজান মানেই বর্ণিল ‘ফানুস’ বা লণ্ঠনের মেলা। কায়রোর প্রতিটি অলিগলি যখন আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে, তখন ইফতারের টেবিলে দেখা মেলে ‘ফুল মুদাম্মাস’-এর। এটি মূলত শিম ও তেলের এক বিশেষ রান্না যা তারা রুটি দিয়ে খায়। মরক্কোতে আবার ইফতারের প্রাণ হলো ‘হারিরা’ নামক এক ওষধি ও পুষ্টিকর স্যুপ। সেখানে সেহরিতে মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য ‘নাফর’ নামক একদল মানুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সুরেলা গান গেয়ে অলিগলিতে ঘুরে বেড়ায়, যা এক হাজার বছরের পুরনো প্রথা।
তুরস্ক ও ইরান:
অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি তুরস্কে ইফতার শুরু হয় বিশেষ ‘রমজান পিদে’ নামক এক প্রকার রুটি দিয়ে। অন্যদিকে ইরানের দস্তরখানে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায় তাদের খাবারের নান্দনিকতায়। জাফরান মিশ্রিত চালের পুডিং ‘শোলে জার্দ’ এবং আখরোট, পনির ও তাজা ফলের সমাহার তাদের ইফতারকে করে তোলে অনন্য ও স্বাস্থ্যকর।
পাশ্চাত্য জগত:
যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের দেশগুলোতে যেখানে মুসলমানরা সংখ্যালঘু, সেখানে রমজান হয়ে ওঠে সামাজিক মেলবন্ধনের মাধ্যম। সেখানে মসজিদ বা কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে সম্মিলিত ইফতারের আয়োজন করা হয়। হোয়াইট হাউসের ইফতার পার্টি থেকে শুরু করে টরন্টোর ইসলামিক সেন্টারের ডিনার সবখানেই পশ্চিমা খাবারের সাথে মিশে থাকে প্রাচ্যের স্বাদ। পিৎজা, পাস্তা কিংবা বার্গারের পাশে সগৌরবে জায়গা করে নেয় আরবের খেজুর আর এশীয় কাবাব।
দেশভেদে খাবারের স্বাদ হয় ভিন্ন, রান্নার ধরণও হয় আলাদা তবে সূর্যাস্তের আগে আজানের অপেক্ষায় থাকা কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন থাকে একই সুতোয় গাঁথা। রমজান আমাদের শেখায়, ভোগে নয় বরং ত্যাগের মধ্যেই প্রকৃত তৃপ্তি। পৃথিবীর সব দস্তরখান যেন এক অভিন্ন আরশের নিচে এসে মিশে যায় এই পবিত্র মাসে।