
নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ ঃ “আমি বন্ধী কারাগারে, আছি গো মা বিপদে, মশার জ¦ালা সহ্য হয় না। এ গান এখন রূপগঞ্জবাসীর ললাটের লিখন। মশা মাছি আর পঁচা পানির দুর্গন্ধে আর ভাল লাগে না। রাতে মশা দিনে মাছি আর সবসময় দুর্গন্ধ নিয়ে আমরা রূপের নগরী রূপগঞ্জে বেঁচে আছি।” এমনি করে মনের দুঃখে কথাগুলো বলেন বিদেশ ফেরত সামসু উদ্দিন মিয়া।
যত্রতত্র ময়লা আর্বজনা ডোবা ও লেকগুলো কচুরিপানায় পূর্ন হয়ে থাকায়, পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতলের কারনে, নদী খালের পানিতে অতিমাত্রায় দূষনের কারনে মশা ও মাছির এই উপদ্রব। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে, দিনে মাছির জ্বালা আর রাতে মশার খেলা। ঘরে-বাহিরে সবখানে একই অবস্থা। পুরো এলাকা জুড়ে মশার উপদ্রব এতই বৃদ্ধি পেয়েছে যে কয়েল, স্প্রে ও মশারী ব্যবহার করেও এদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না মানুষ।
ব্যবসার খাতিরে সারাদিন বাইরেই কাটাতে হয় নগর পাড়ার ইকবাল হোসেনের। তার স্ত্রী মনি হোসেন ছেলেদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে মেয়েকে নিয়ে বাসায় দিন কাটান। সাংসারিক কাজ আর মেয়েকে সামলাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তিনি বলেন, দিনে-দুপুরে মশারি খাটিয়ে রাখতে হয় মেয়ের জন্য। তাতেও রেহাই পাওয়া কষ্ট। আর রাত হলেতো কথাই নেই। মশার ভন-ভন শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। এতো মশা অথচ সরকার এইগুলা দেহেনা, হেরা আছে খালি রাজনীতি নিয়া।
মশার উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে রূপগঞ্জে বসবাসরত কয়েক লাখ মানুষ। কয়েল জ্বালিয়ে, ধূপ পুড়িয়ে, এ্যারোসল ¯েপ্র করে কিংবা মশা মারার বৈদ্যুতিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যাচ্ছে না। স্কুল-কলেজগুলোতেও দিন দিন বেড়েই চলছে মশার উপদ্রব। অথচ এ বিষয়ে একেবারেই নির্বিকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। মশার জন্মস্থান নোংরা ড্রেন ও জলাশয়গুলোও পরিষ্কার করা হচ্ছে না। মশার লার্ভা মারার জন্যও কোন লার্ভিসাইডসহ অন্য কোন ওষুধ ¯েপ্র করা হচ্ছে না।
নদীতীরবর্তী মানুষেরা জানান, আগে আমাদের এলাকাতে মশা ছিল না। এই অবিশপ্ত পঁচা পানি আসার পর থেকে মশার উপদ্রব বাড়তে থাকে। বালু ও শীতলক্ষ্যা নদের পচা পানি মশার বংশ বৃদ্ধির কারণ। তাছাড়া নোংরা ড্রেন ও জলাশয়তো রয়েছেই।নগরপাড়া, খামারপাড়া, কামসাইর, ইছাখালী, বড়ালু, পাড়াগাও, পূর্বগ্রাম, গঙ্গানগর, রূপসী, মুড়াপাড়া, সানিয়াদি, নিমেরটেক, বরুনা, নাওড়া, মাঝিনা, হরিণা, বাঘবাড়ী, দেইলপাড়া, নয়ামাটি, দক্ষিণপাড়া, কেওডালাসহ প্রায় অর্ধশত গ্রামের মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। বালু নদের পচা পানি ও আশপাশের জলাশয়ের কারণেই মশার উৎপাত বেশি বলে জানা যায়।
গঙ্গানগর এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, খাইতে বইলেও মশার কারণে শান্তি পাইনা। খাবারের লগে(সাথে) মশাও মুখে ঢুইক্ক্যা যায়। এর থেইক্ক্যা কি কোন নিস্তার পামুনা। নগরপাড়া বাজারের চায়ের দোকানি সাগর মিয়া বলেন, দুর্গন্ধ আর ময়লা পঁচারমশার উৎপাতের কারণে দোকোনে লোকজন চা খেতে আসাও বন্ধ করে দিয়েছে। কোন উপায় না পেয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেই ধূপের ধূয়া আর কয়েল জ্বালিয়ে দেই।
কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক সফল চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা এ্যাড. গোলজার হোসেন বলেন, রূপগঞ্জে রয়েছে বালুনদী ও শীতলক্ষ্যানদী। দুষণের কারনে নদীগুলোতে এখন আর পানি নেই যা আছে তাকে স্থানীয়রা পঁচা বলে থাকে। পঁচার কারনে নদীতে মাছের উৎপাদন ও বংশ বৃদ্ধি হচ্ছে না । নদীতে পচা পানিটার কারণেই মশার উৎপাত বেশি। মশার জ্বালায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পঁচা পানি রোধ করা গেলেই এসব এলাকার মশা কমে যেতো।
এ ব্যাপারে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, রূপগঞ্জের আনাচে কানাচে ব্যাপক মৎস্য চাষ হচ্ছে। মশার ওষুধ ছিটালে মৎস্যচাষ ব্যাহত হবে । ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রকল্প দেয়া আছে, দু’ এক দিনের মধ্যে কার্যক্রম শুরু হবে। মুড়াপাড়া দাউদপুর ইউনিয়নে ইতিমধ্যে মশা নিধন কার্যক্রম শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ। ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ফান্ড থেকে পর্যায়ক্রমে সবগুলোতেই মশক নিধন কার্যক্রম শুরু হবে। তাছাড়া পৌরসভাগুলোতে এখাতে বরাদ্ধ অনুযায়ী মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনগন এর সুফলও পাচ্ছে।