
কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি:
শীতের আগমনী বার্তা মানেই গ্রামবাংলার প্রকৃতিতে এক অন্যরকম আবহ। কুয়াশায় ঢাকা ভোর, হিমেল বাতাস আর খেজুরের রসের মিষ্টি ঘ্রাণ—সব মিলিয়ে শীতের সকাল যেন বাংলার চিরচেনা এক সৌন্দর্য। শীতের এই ঐতিহ্যকে ঘিরে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলায় আগাম খেজুরের রস আহরণ ও গুড় তৈরির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা।
শীত পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই খেজুরগাছ প্রস্তুত করতে শুরু করেছেন স্থানীয় গাছিরা। কেউ গাছের শুকনো পাতা পরিষ্কার করছেন, কেউ আবার গাছের মাথা কেটে রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলছেন। খেজুরের রস সংগ্রহের হাঁড়ি, দড়ি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে চলছে নানা ব্যস্ততা। তাঁদের আশা, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে মিলবে পর্যাপ্ত রস, আর সেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে সুস্বাদু খেজুরের গুড়।
রবিবার ( ১১ অক্টোবর) সকালে কোটচাঁদপুর উপজেলার রাজাপুর গ্রামে দেখা মিলল এমনই এক কর্মব্যস্ত গাছির। তিনি মৃত আমজাদের ছেলে আব্দুল। আগাম খেজুরের রস আহরণের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। শীতের মৌসুমকে সামনে রেখে খেজুরগাছ প্রস্তুত করার পাশাপাশি রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাজ গুছিয়ে নিচ্ছেন।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস শুধু শীতের সকালের এক অনন্য স্বাদ নয়, এটি এ অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও লোকজ সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছ থেকে নামানো টাটকা রস খেতে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। সেই রস দিয়ে তৈরি হয় সুস্বাদু পাটালি গুড়, ঝোলা গুড় ও নানা ধরনের পিঠা-পায়েস। শীতের সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খেজুরের রস পান কিংবা রস দিয়ে তৈরি পিঠা খাওয়ার আনন্দ গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
খেজুরের রস ও গুড়কে কেন্দ্র করে শীতের মৌসুমে স্থানীয় বাজারেও তৈরি হয় বাড়তি প্রাণচাঞ্চল্য। গাছিরা রস সংগ্রহ, জ্বাল দেওয়া ও গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাশাপাশি রস ও গুড় বিক্রির মাধ্যমে অনেক পরিবার বাড়তি আয়ের সুযোগ পায়। ফলে খেজুরের রস শুধু খাদ্যরসিকদের তৃপ্তিই মেটায় না, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রয়োজন খেজুরগাছের যত্ন ও সংরক্ষণ। পাশাপাশি নিরাপদ উপায়ে রস সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে গুড় তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শীতের কুয়াশাভেজা ভোরে গাছির কাঁধে হাঁড়ি, গাছের ডগায় বাঁধা মাটির পাত্র আর চুলায় ফুটতে থাকা খেজুরের রস—এ দৃশ্য যেন গ্রামবাংলার শীতের এক চিরচেনা ছবি। কোটচাঁদপুরের গাছিদের আগাম প্রস্তুতিতে সেই ঐতিহ্যেরই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে। প্রকৃতিতে শীতের পরশ আরও গভীর হলে খেজুরের রস ও গুড়ের মিষ্টি স্বাদে মুখর হয়ে উঠবে জনপদ—এমন প্রত্যাশাই স্থানীয়দের।
খেজুরের রসের মিষ্টি স্বাদ আর গুড়ের ঘ্রাণে শীতের সকাল হয়ে উঠুক আরও প্রাণবন্ত—বেঁচে থাকুক বাংলার এই চিরায়ত ঐতিহ্য।