
ইসলাম ডেক্স
আল্লাহর পথে খরচ করা, দান–সদকা করা ইসলামের অন্যতম ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। কুরআন মাজিদে বারবার আল্লাহ তাআলা তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দানকারীদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে মহাপুরস্কারের সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় মানুষের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে, সম্পদকে বরকতময় করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সহজ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
اَلَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ثُمَّ لَا یُتۡبِعُوۡنَ مَاۤ اَنۡفَقُوۡا مَنًّا وَّ لَاۤ اَذًی ۙ لَّهُمۡ اَجۡرُهُمۡ عِنۡدَ رَبِّهِمۡ ۚ وَ لَا خَوۡفٌ عَلَیۡهِمۡ وَ لَا هُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ
‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তারপর যা ব্যয় করেছে তার পর কোনো খোঁটা দেয় না এবং কোনো কষ্টও দেয় না—তাদের জন্য তাদের রবের কাছে প্রতিদান রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৬২)
এই আয়াতে আল্লাহ দানের সঙ্গে নিয়ত, আচরণ ও মনোভাবের গুরুত্বও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। শুধু দান করাই যথেষ্ট নয়; বরং তা হতে হবে নিঃস্বার্থ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
দানের প্রতিদান বহুগুণে বৃদ্ধি করেন আল্লাহ
আল্লাহ তাআলা দানকারীদের উৎসাহ দিতে আরেক আয়াতে দানের প্রতিদান সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন—
مَثَلُ الَّذِیۡنَ یُنۡفِقُوۡنَ اَمۡوَالَهُمۡ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ كَمَثَلِ حَبَّۃٍ اَنۡۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِیۡ كُلِّ سُنۡۢبُلَۃٍ مِّائَۃُ حَبَّۃٍ ؕ وَ اللّٰهُ یُضٰعِفُ لِمَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَ اللّٰهُ وَاسِعٌ عَلِیۡمٌ
‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের দানের দৃষ্টান্ত একটি বীজের মতো—যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়, প্রতিটি শীষে একশত দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তার জন্য আরও বাড়িয়ে দেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৬১)
দান কবুল হওয়ার শর্ত: সম্পদ হতে হবে হালাল
তবে কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—দান কবুল হওয়ার জন্য সম্পদ অবশ্যই হালাল হতে হবে। আল্লাহ তাআলা নিজে পবিত্র; তিনি পবিত্রতাই ভালোবাসেন এবং কেবল পবিত্র উৎস থেকে আসা দানই গ্রহণ করেন। হালাল সম্পদ থেকে অল্প পরিমাণ দানও আল্লাহর কাছে অশেষ মূল্যবান হয়ে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছুই গ্রহণ করেন না।’ (মুসলিম ১০১৫)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন—
مَنْ تَصَدَّقَ بِتَمْرَةٍ مِنْ كَسْبٍ طَيِّبٍ ـ وَلَا يَقْبَلُ اللَّهُ إِلَّا الطَّيِّبَ ـ فَإِنَّ اللَّهَ يَتَقَبَّلُهَا بِيَمِينِهِ، ثُمَّ يُرَبِّيهَا لِصَاحِبِهَا كَمَا يُرَبِّي أَحَدُكُمْ فَلُوَّهُ، حَتَّى تَكُونَ مِثْلَ الْجَبَلِ
‘যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন থেকে একটি খেজুর পরিমাণ সদকাও করে—আর আল্লাহ হালাল ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না— আল্লাহ তা তার ডান হাতে গ্রহণ করেন। তারপর তিনি তা সদকাকারীর জন্য লালন-পালন করতে থাকেন, যেমন তোমাদের কেউ তার ঘোড়া বা উটের শাবক লালন-পালন করে; এমনকি তা পাহাড়সম হয়ে যায়।’ (মুসলিম ১০১৪)
হারাম সম্পদ দান: সওয়াব নয়, গুনাহ
হারাম উপায়ে উপার্জিত সম্পদ দিয়ে দান করলে তা আল্লাহর কাছে কবুল হয় না। বরং এতে দানকারীর গুনাহই বৃদ্ধি পায়। কারণ, হারাম উপার্জনের মাধ্যমে আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ جَمَعَ مَالًا مِنْ حَرَامٍ ثُمَّ تَصَدَّقَ بِهِ لَمْ يَكُنْ لَهُ فِيهِ أَجْرٌ، وَكَانَ إِصْرُهُ عَلَيْهِ
‘যে ব্যক্তি হারাম সম্পদ উপার্জন করে, অতঃপর তা দিয়ে দান করে— তার জন্য এতে কোনো সওয়াব নেই; বরং এর পাপ তার ওপরই বর্তায়।’ (আত-তাবরানি, আল-মু‘জামুল কাবির)
তওবার পথ: হারাম সম্পদ কিভাবে পরিশুদ্ধ হবে
কেউ যদি আন্তরিকভাবে হারাম পথ ছেড়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে চায়, তওবা করতে চায়—তাহলে তার ওপর কয়েকটি দায়িত্ব অবধারিত হয়ে যায়—
১. হারাম উপার্জন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা
২. অন্যায়ভাবে কারো সম্পদ আত্মসাৎ করে থাকলে তা প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া
৩. কারো হক নষ্ট করলে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করা
৪. মালিক খুঁজে পাওয়া সম্ভব না হলে সেই সম্পদ দরিদ্র ও অসহায়দের মাঝে বিতরণ করা
এভাবে হারাম সম্পদ পরিশোধ করলে সে সদকার সওয়াব পাবে না, তবে যদি তওবা আন্তরিক হয়—তাহলে আল্লাহর কাছে তওবার সওয়াব ও ক্ষমার আশা করতে পারবে।
ইসলামে উদ্দেশ্য কখনই হারামকে বৈধ বানানো নয়। বরং হালাল পথে চলাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির একমাত্র রাস্তা। দান তখনই মূল্যবান হয়, যখন তা আসে হালাল উপার্জন ও খাঁটি নিয়ত থেকে। হারাম সম্পদ দান করে জান্নাত কেনা যায় না; তবে হারাম বর্জন করে, তওবার মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে ফিরে এলে—রহমতের দরজা অবশ্যই খোলা থাকে। আল্লাহ আমাদের হালাল উপার্জনের তৌফিক দিন, দানকে কবুল করুন এবং সব হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।