
জারিন তাসনিম নূর
আমরা প্রায়ই শুনি আমাদের দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যায়, কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি এই টাকার প্রকৃত মালিক কে বা কারা? এই টাকার মালিক শুধু রাষ্ট্র নয়, বরং এই দেশের নাগরিকের, আপনার, আমার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। অর্থ পাচারের মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশের মানুষের বিকাশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ব্যাঘাত ঘটাই । এই টাকা দিয়ে হতে পারতো আমাদের অবকাঠামো মূলক উন্নয়ন এবং এই টাকা দিয়েই হওয়ার কথা ছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতি, হাসপাতালের চিকিৎসা, কৃষকের সেচ, কিংবা রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন। কিন্তু যখন অবৈধ অর্থ পাচার হয়, তখন সেই স্বপ্নগুলো থমকে যায়। অর্থপাচার শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয় বরং এটি নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার বিরুদ্ধাচরণ। যারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য দেশের অর্থ বিদেশে নিয়ে যায়, তারা কেবলই আইন ভাঙে না বরং তারা পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।তাই এই অপরাধ যতটা না আর্থিক ঠিক ততটাই মানবিক।
আমরা প্রায়ই বলি, আমাদের দেশে সুযোগ নেই, কাজ নেই, উন্নয়ন ধীর। কিন্তু এ কথা কি ভাবি যে, যে দেশের সম্পদ অন্য দেশে পাচার হয়, সেই দেশ কীভাবে সামনে আগাবে? অর্থপাচারের কারণে বিদেশে পুঁজি জমা হয়, আর আমাদের দেশে বিনিয়োগ কমে যায়। ফলে কর্মসংস্থান কমে, মূল্যস্ফীতি বাড়ে, আর সাধারণ মানুষ আরও কষ্টে পড়ে।
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ আজ এগিয়ে গেছে সঠিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে। আর আমাদের দেশ এখনও পিছিয়ে থাকে ঘন ঘন ব্যাংকিং কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি এবং অবৈধ অর্থপাচারের কারণে। তাই দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগানো এখন সময়ের দাবি। আমরা সবাই যদি সচেতন না হই, তাহলে এই প্রবণতা থামানো সম্ভব হবে না। প্রত্যেক নাগরিকের উচিত সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা।
এ সকল অবৈধ অর্থপাচারের বিরুদ্ধে যে আইন রয়েছে তা হলো Money Laundering Prevention Act, 2012। এই আইনে অপরাধীদের শাস্তি, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ এবং তদন্তের বিভিন্ন বিধান রাখার মাধ্যমে রাষ্ট্র আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই অপরাধে ধরা পড়লে, আইন অনুযায়ী ৪ থেকে ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি বাজেয়াপ্তি বা তার দ্বিগুণ অর্থদণ্ড বা ন্যূনতম ১০ লাখ টাকার জরিমানার শাস্তি রয়েছে। শুধু ব্যক্তি নয় বরং কোনো প্রতিষ্ঠানও যদি এই অপরাধে জড়িত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন বাতিলের মতো কঠোর আইনগত ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে পারে।
আইন থাকলেই হবে না বরং এর প্রয়োগ হয় কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব আমাদের। যদি সন্দেহজনক কোনো আর্থিক লেনদেন দেখি তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী সহ সকলকে সতর্ক হতে হবে। আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্ববোধ। আমাদের প্রত্যেকের বুঝতে হবে, দেশের অর্থ দেশের কোন কয়েকজন ব্যক্তির নয়। ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাষ্ট্রের অর্থ বিদেশে পাচার করা প্রকৃত অর্থে দেশের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। তাই সন্দেহজনক লেনদেন সম্পর্কে সতর্ক থাকা, আর্থিক নৈতিকতা অনুসরণ করা এবং দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। শুধুমাত্র সরকারের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে নিজেদের সচেতন হওয়া অতীব জরুরি । প্রত্যেক নাগরিকই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ালে, অর্থপাচারের মতো অপরাধ নিজে থেকেই কমে যাবে।
বিদেশে অবৈধভাবে অর্থ পাচার হলে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ খাতে অর্থ ঘাটতি তৈরি হয়। যার ফলে দেশের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি সুরক্ষিত রাখতে এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে অবৈধ অর্থপাচারের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। আমরা সবাই সচেতন হলে দেশ বাঁচবে এবং জাতির সম্পদ জাতির মধ্যেই থাকবে।
জারিন তাসনিম নূর
৪র্থ বর্ষ, আইন বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।