
রাজিমুল ইসলাম রাজিব
লক্ষ্মীপুরের প্রান্তিক এক গ্রাম। শান্ত সবুজে মোড়া প্রকৃতি, সরু মাটির রাস্তা আর কৃষিজীবী মানুষের পরিশ্রমে ভরা দিনযাপন। ঠিক এই সাধারণ—কিন্তু গল্পে ভরা—মাটিতেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা কে এম রেদায়ুনুল বারি জিয়নের। বয়সে তরুণ হলেও মানসিকতায় তিনি বহুদূর এগিয়ে থাকা এক স্বপ্নসাধক। মানুষের জন্য কিছু করা, সমাজকে এগিয়ে নেওয়া এবং নিজের উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম—এই তিনটি বিষয় জিয়নকে অনন্য করে তুলেছে।
শৈশব থেকেই জিয়ন ছিলেন কৌতূহলী। গ্রামের অন্যান্য বাচ্চারা যেখানে খেলাধুলা আর আড্ডায় মগ্ন থাকত, জিয়ন সেখানে নিজের চারপাশের সমস্যাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি দেখতেন দরিদ্র মানুষের সংগ্রাম, শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়া তরুণদের হতাশা এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে গ্রামের অনেকের সুযোগ হারানো। এসবই তাকে অন্যরকম এক ভাবনায় জাগিয়ে তোলে—“পরিবর্তন আসবেই, যদি কেউ শুরুটা করে।”
শিক্ষার প্রতি অদম্য অনুরাগ
জিয়নের পরিবার সম্পূর্ণ মধ্যবিত্ত, সীমাবদ্ধতার অভাব ছিল না। তবে তার বাবা-মা শিক্ষার গুরুত্ব জানতেন এবং ছেলের প্রতি বিশ্বাস ছিল অটুট। স্কুলজীবন থেকেই জিয়ন ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার পাশাপাশি তিনি পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিষয়েও আগ্রহী ছিলেন—বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও আধুনিক দক্ষতা উন্নয়ন। কম্পিউটার নিয়ে প্রথম পরিচয় হয় ক্লাস সেভেনে, তখনই মনে গভীরে একটা স্বপ্ন জেগে ওঠে—জ্ঞান অর্জন করে নিজের গ্রামের মানুষের জীবনেও প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া।
কলেজে ওঠার পর তার আগ্রহ আরও বাড়ে। বিভিন্ন অনলাইন কোর্স, প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত চর্চার মাধ্যমে জিয়ন প্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল স্কিলস এবং সামাজিক নেতৃত্ব সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন করেন। এতে একদিকে যেমন তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন ভবিষ্যতের জন্য, অন্যদিকে তার এই যাত্রা গ্রামের অনেক তরুণের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
সমাজের জন্য কাজ করার প্রেরণা
জিয়নের বিশেষত্ব শুধু নিজের উন্নয়নেই নয়; বরং সে বিশ্বাস করে—“নিজে উন্নত হলে হবে না, সমাজও উন্নত হতে হবে।” তার এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম।
তিনি গ্রামের শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় উৎসাহিত করা, অনুন্নত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ত করার কাজে এগিয়ে আসেন। কেউ যদি বই কেনার সামর্থ্য না পায়, জিয়ন নিজের সংগ্রহ থেকে বই দেয়; কেউ ডিজিটাল দক্ষতা শিখতে চাইলে তাকে ঘরে বসে প্রশিক্ষণ দেয়। মাদকবিরোধী প্রচারণা, বৃক্ষরোপণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান—সব ক্ষেত্রেই জিয়নের সক্রিয় উপস্থিতি তাকে আলাদা করে তোলে।
নেতৃত্বের গুণে উজ্জ্বল
জিয়ন একজন স্বাভাবিক নেতা। কথায় ও কাজে তিনি যে আত্মবিশ্বাস দেখান, তাতে তার সমবয়সী এবং ছোটরা সহজেই অনুপ্রাণিত হয়। কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হোক বা কোনো উদ্যোগের পরিকল্পনা, জিয়নের নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া তরুণেরা দেখেছে সংগঠিত সমাজ পরিবর্তনের পথ। তিনি জানেন, একা একা কিছু করা সম্ভব না, দল গঠন জরুরি—আর সেই দলকে নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন স্বপ্ন পূরণের পথে।
প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন আনার স্বপ্ন
জিয়নের বড় লক্ষ্য হলো নিজের এলাকার তরুণদের প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক প্রশিক্ষণ ও ইন্টারনেটের সুবিধা ব্যবহার করতে পারলে গ্রামের শিক্ষার্থীও শহরের সমান সুযোগ পেতে পারে।
এই ভাবনা থেকে জিয়ন নিজের বাড়িতেই ছোট করে ডিজিটাল লার্নিং সেশন শুরু করেন। সেখানে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা কম্পিউটার ব্যবহার, টাইপিং, গ্রাফিক্স ডিজাইন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের বেসিক ধারণা, অনলাইনে নিরাপত্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার সঠিক ব্যবহার—এসব শিখছে। তার এই প্রচেষ্টা ইতোমধ্যেই প্রশংসা কুড়িয়েছে অভিভাবকদের কাছ থেকেও।
মানবিকতা—তার সবচেয়ে বড় পরিচয়
অনেকেই শুধু নিজের উন্নয়ন নিয়েই ব্যস্ত থাকে, কিন্তু জিয়নের পথ আলাদা। তিনি মনে করেন—মানবিকতা ছাড়া বড় হওয়া অসম্ভব। কোনো পরিবার বিপদে পড়লে তিনি যতটুকু পারেন সাহায্য করেন। অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য তহবিল সংগ্রহ, দরিদ্র ছাত্রদের ফরম ফিলাপ ফি দেওয়া, বন্যা বা শীতকালে খাদ্য ও পোশাক বিতরণ—এসব কাজ তিনি কোনো প্রচারের জন্য করেন না, করেন হৃদয়ের টানে।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা
আগামী দিনের জন্য জিয়নের পরিকল্পনা যথেষ্ট বড় এবং সুসংগঠিত। তিনি চান প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তুলতে, যেখানে গ্রামের তরুণরা আধুনিক দক্ষতা অর্জন করে নিজের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারবে। পাশাপাশি তিনি সামাজিক নেতৃত্ব, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং যুব সংগঠনের মাধ্যমে একটি উন্নত ও সচেতন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
জিয়ন বলেন—“আমি চাই আমার গ্রামের মানুষ উন্নত হোক। আমি চাই প্রতিটি তরুণ বিশ্বাস করুক যে তার ভেতরেও আলো আছে। শুধু সেই আলো জ্বালিয়ে দিতে কেউ একজন পাশে দাঁড়ানো দরকার। আমি সেই পাশে দাঁড়ানো মানুষ হতে চাই।”
শেষকথা
কে এম রেদায়ুনুল বারি জিয়ন এমন এক তরুণ, যার চোখে স্বপ্ন আছে, হৃদয়ে মানবিকতা আছে, আর কর্মে পরিবর্তনের শক্তি আছে। তিনি প্রমাণ করছেন—পরিবর্তন বড় কিছু দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় একটি ছোট ইচ্ছা, একটি ছোট উদ্যোগ এবং একটি বড় মন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
তার পথচলা যতই দীর্ঘ হোক, এক জিনিস স্পষ্ট—এই তরুণ নিজের আলো দিয়ে একদিন অনেককেই আলোকিত করবে।