
কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শামসুলের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, অফিসের অর্থ আত্মসাৎ, দায়িত্বে অবহেলা ও ইচ্ছেমতো অফিস করার অভিযোগ উঠেছে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোটচাঁদপুরে যোগদানের পর থেকেই এসব অভিযোগ চলে আসছে বলে স্থানীয়দের দাবি। অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শামসুল নিয়মিত অফিস করেন না। অনেক সময় বেলা ১১টার দিকে অফিসে এসে দুপুর ১টার মধ্যেই চলে যান। আবার অফিসে খোঁজ নিতে গেলে তাকে জেলা কার্যালয়ে থাকার কথা জানানো হয়। তবে জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিলকিস আফরোজ জানিয়েছেন, মাসিক সভা ছাড়া তাকে নিয়মিত জেলা অফিসে দেখা যায় না।
অভিযোগ রয়েছে, অফিসে নিজের অনুপস্থিতি আড়াল করতে উপজেলা পরিষদের রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন একটি গোপন পকেট গেট ব্যবহার করেন তিনি। এছাড়া কর্মদিবসের অধিকাংশ সময় ঝিনাইদহ শহরের মর্ডান মোড় এলাকায় নিজের বাসায় অবস্থান বা আড্ডা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এদিকে, অফিসের সরকারি মোটরসাইকেল নিজ বাসায় রেখে ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শামসুল মোটরসাইকেল বাসায় রাখার বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো অফিসের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ।
অনুসন্ধানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দফার বরাদ্দের একটি তালিকায় বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এর মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান বাবদ ৩০ হাজার টাকা, পেট্রোল ও মোটরযান বাবদ ৮ হাজার ৫০০ টাকা, আসবাবপত্র বাবদ ৪৭ হাজার টাকা, কম্পিউটার বাবদ ১৫ হাজার টাকা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বাবদ ৬ হাজার টাকা এবং অফিস সরঞ্জাম বাবদ ৬ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব খাতে বাস্তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় না করেই বিল-ভাউচার দেখিয়ে অর্থ তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিবছর প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় অফিস পরিচালনা ও বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হয়। যোগদানের পর থেকে প্রায় চার বছর ধরে এসব বরাদ্দের অর্থের একটি অংশ আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে সরেজমিনে অফিসের আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম পরিদর্শনে বহু বছরের পুরোনো চেয়ার-টেবিল, জং ধরা স্টিলের আলমারি, ফাইল কেবিনেটসহ জরাজীর্ণ সামগ্রী দেখা গেছে বলে অভিযোগকারীরা জানান। এতে বরাদ্দের অর্থে আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম কেনার হিসাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রশিক্ষণের বরাদ্দ একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বারবার দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তালসার মাতৃছায়া ফাউন্ডেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ বরাদ্দ পাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
এছাড়া বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও প্রশিক্ষণের বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় না করার অভিযোগও রয়েছে। অফিসের ঝাড়ুদারদের বেতন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগও উঠেছে। এমনকি প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে স্থানীয় সাংবাদিকদের দাবি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা শামসুলের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি মোটরসাইকেল বাসায় রাখার বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে স্বীকার করেন। তবে অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি নিজের পক্ষে ব্যাখ্যা দেন।
অভিযোগের বিষয়ে কোটচাঁদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসাইনের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত হয়েছেন। তার ভাষ্য, আগে যা করেছেন, করেছেন। আমার সময়ে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হলে প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঝিনাইদহ জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিলকিস আফরোজ বলেন, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা তিনি জানেন। বিষয়গুলো নিয়ে কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সেবা প্রত্যাশীদের দাবি, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।