
খুবি প্রতিনিধি : ফিরোজ হাসান
একজন শিক্ষার্থীর কাছে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা এবং নিরাপত্তার সর্বোচ্চ আশ্রয়স্থল। তবে অনেক নারী শিক্ষার্থীর মতে, বাস্তবে তারা সব সময় সেই নিরাপত্তা অনুভব করেন না। বিভিন্ন সময় হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতার কারণে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ১০৬ একরের ক্যাম্পাস কতটা নিরাপদ?
নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করতে নারী শিক্ষার্থীদের মতামত তুলে ধরেছেন দৈনিক ভোরের বাংলা নিউজের ক্যাম্পাস প্রতিনিধি ফিরোজ হাসান।
“নিরাপদ ক্যাম্পাস শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার” — নওশিন ইসলাম (এফডব্লিউটি ডিসিপ্লিন)
নওশিন ইসলাম বলেন, নিরাপদ ক্যাম্পাস প্রতিটি শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেই অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে না। তাঁর মতে, শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নয়, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেও নারী শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারেন না। তিনি মনে করেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
“১০৬ একর হোক স্বপ্নবোনার নিরাপদ ঠিকানা” — এস. এম. ফাতেমা আক্তার (ইংরেজি ডিসিপ্লিন)
ফাতেমা আক্তার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু উচ্চশিক্ষার স্থান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন গড়া, ব্যক্তিত্ব বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। তাই এমন একটি ক্যাম্পাস গড়ে উঠা উচিত, যেখানে সবাই নিরাপত্তা, সম্মান ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পাবে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের আস্থায় বড় ধরনের আঘাত লাগে। তাঁর মতে, অভিযোগ সুষ্ঠু তদন্তে প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি বলেন, শিক্ষক সমাজ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের প্রতীক। তাই তাঁদের অসদাচরণ পুরো শিক্ষার্থীসমাজের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার নীতি বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান তিনি।
“ভয়মুক্ত ক্যাম্পাসই জ্ঞানচর্চার প্রকৃত পরিবেশ” — দীপা (এটি ডিসিপ্লিন)
দীপা বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় মানেই মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও প্রতিবাদের চর্চার স্থান। এটি কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়। তাই শিক্ষাঙ্গন এমন হওয়া উচিত, যেখানে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের ভয়, হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার না হয়ে স্বাধীনভাবে পড়াশোনা করতে পারবেন।
তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন সময় নারী শিক্ষার্থীরা ইভটিজিং, যৌন হয়রানি এবং কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অনৈতিক আচরণের মুখোমুখি হন, যা তাঁদের স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অনুষ্ঠানে বহিরাগতদের উপস্থিতিতে নারী শিক্ষার্থীদের উত্যক্ত করা ও মাদক সেবনের মতো ঘটনাও ঘটে বলে তিনি দাবি করেন। এসব বিষয়ে প্রশাসনের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তিনি।
“যৌন হয়রানি প্রতিরোধসহ সব ধরনের নিরাপত্তা সংকটে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন” — সুজনা মেহরিন সৌমি (আইন ডিসিপ্লিন)
সুজনা মেহরিন সৌমি বলেন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নারীদের নিরাপত্তার জন্য ইতিবাচক হলেও, শুধু এটুকুই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, প্রকৃত নিরাপত্তা নির্ভর করে প্রশাসনিক কার্যকারিতা, আবাসন ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছতা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর।
তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও হয়রানির অভিযোগ সামনে আসছে, যা উদ্বেগের বিষয়। তাই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও ভয়মুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব।