
টাংগাইল জেলা প্রতিনিধি
রাহিদ রানা
টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে চরম আতঙ্কের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছেন বেপরোয়া মামলাবাজ, কুখ্যাত ভূমিদস্যু ও চিহ্নিত সন্ত্রাসী আতাউর রহমান ওরফে আতর আলী। যার ক্রমাগত অত্যাচার, সীমাহীন ভূমিলুণ্ঠন এবং একের পর এক মিথ্যে ও হয়রানিমূলক কাল্পনিক মামলার বিষাক্ত ছোবলে অতিষ্ঠ ও নাজেহাল হয়ে পড়েছেন পুরো এলাকার হাজার হাজার নিরীহ অধিবাসী। ঘাটাইলের ছয়ানী বকশিয়া গ্রামের অধিবাসী এই আতর আলী দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী লালন-পালন করে সাধারণ মানুষের জমিজমা জবরদখলসহ নানা জনস্বার্থবিরোধী ও অসামাজিক অপরাধ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন। যার তাণ্ডবে স্থানীয় ভুক্তভোগীরা দিন কাটাচ্ছেন চরম অনিরাপত্তা ও দুশ্চিন্তার মধ্যে। এই চিহ্নিত অপরাধীর জঘন্য অপকর্ম, বেপরোয়া ভূমিগ্রাস এবং একের পর এক মিথ্যে মামলা দিয়ে মানুষকে হেনস্তা করার কঠোর বিচার ও স্থায়ী শাস্তির সুনির্দিষ্ট দাবিতে সম্প্রতি ছয়ানী বকশিয়া, দশানী বকশিয়া, বীরসিংহ, আথাইল শিমুল এবং এর আশপাশের কয়েকটি পার্শ্ববর্তী গ্রামের ভুক্তভোগী অধিবাসীরা একজোট হয়ে সংবাদ সম্মেলন ও বিশাল প্রতিবাদ কর্মসূচির পাশাপাশি মানববন্ধন গড়ে তোলেন। সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ ও ন্যায়ের পক্ষে প্রতিবাদ সভা দেখে চরম ক্ষোভে ফেটে পড়েন ভূমিদস্যু আতর আলী। তিনি প্রতিবাদকারীদের মুখ বন্ধ করতে এবং নিজের অপরাধের রাজত্ব অটুট রাখতে চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠেন। সেই প্রতিশোধপরায়ণতার ধারাবাহিকতায় তিনি বিন্দুমাত্র বিলম্ব না করে প্রতিবাদ কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া নিরীহ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক সম্পূর্ণ বানোয়াট, মিথ্যে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাঁদাবাজির মামলা ঠুকে দিয়ে চরম হয়রানি শুরু করেছেন।
মামলাবাজ আতর আলীর এই বেপরোয়া ও প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড কেবল সাধারণ প্রতিবাদী অধিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সত্য ঘটনা প্রকাশ করায় এবং তার অপকর্মের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরায় তিনি সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধনে পেশাগত দায়িত্ব পালনরত নিরপরাধ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেও কাল্পনিক চাঁদাবাজির মিথ্যে মামলা দায়ের করেছেন, যা এলাকার সচেতন নাগরিকদের হতবাক করেছে। এই নজিরবিহীন ও ন্যক্কারজনক ঘটনায় টাঙ্গাইলের স্থানীয় বিভিন্ন মহলে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ ও তীব্র নিন্দার তীব্র ঝড় উঠেছে। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের জোরালো অভিযোগ সাধারণ মানুষের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাংবিধানিক অধিকার ও প্রতিবাদের কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ ও রুদ্ধ করতেই চরম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এবং উদ্দেশ্যমূলক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এই হয়রানিমূলক মিথ্যে মামলাগুলো সাজানো হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত সূত্রে জানা যায়, অনিয়ম, চরম অব্যবস্থাপনা, জমিজমা জোরপূর্বক জবরদখল এবং জনস্বার্থবিরোধী নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ঘাটাইল উপজেলায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন ও সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ওই এলাকার কয়েকজন সচেতন ও সাহসী ব্যক্তি বলিষ্ঠ পদে এগিয়ে এসেছিলেন। তারা কোনো ধরনের ব্যক্তিস্বার্থ না রেখে সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা ও এলাকাকে ভূমিদস্যুমুক্ত করার লক্ষ্যে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তুলেছিলেন। কিন্তু সেই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার চরম মাশুল হিসেবে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যে মামলা দায়েরের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই সমগ্র ঘাটাইলে জুড়ে নজিরবিহীন তোলপাড়, ব্যাপক আলোচনা ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য ও অভিযোগ হলো, তারা জীবন ধারণের ক্ষেত্রে কিংবা প্রতিবাদ প্রকাশের জায়গায় কোনো অবস্থাতেই কোনো অন্যায়, বিশৃঙ্খলা বা আইনবিরোধী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে দূরতমভাবেও জড়িত ছিলেন না। তারা সম্পূর্ণ আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের সুরক্ষা, হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি উদ্ধার এবং ন্যায্য দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কারণে এভাবে ভিত্তিহীন ও মিথ্যে মামলার শিকার হতে হওয়ায় পুরো এলাকার বিচারব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজে যেকোনো নাগরিকের অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও ভুক্তভোগী ও প্রতিবাদকারীদের অধিকার রক্ষা না করে উল্টো মামলা দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করার এই জঘন্য অপচেষ্টাকে তীব্র ভাষায় নিন্দা জানিয়েছেন ঘাটাইলের বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সচেতন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, কোনো সচেতন নাগরিক যখন এলাকায় চলা বেপরোয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন, তখন প্রশাসনের উচিত ছিল তার অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করা। কিন্তু তা না করে উল্টো অপরাধীর ইশারায় প্রতিবাদকারীদের ওপর মিথ্যে মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া আইনের শাসনের প্রতি চরম অবমাননা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই এলাকার সচেতন মহলের জোর দাবি, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অবিলম্বে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন কোন উদ্দেশ্যে এবং কোন বিভ্রান্তিকর অভিযোগের ভিত্তিতে এই হয়রানিমূলক মামলাগুলো করা হয়েছে, যাতে করে কোনো নিরপরাধ মানুষ প্রশাসনিক ও আইনি হয়রানির শিকার না হন এবং দ্রুততম সময়ে প্রকৃত সত্য উন্মোচিত হয়ে ভুক্তভোগীদের উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত হয়।
এদিকে ঘাটাইল থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে এই সাজানো মামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য কি এবং মামলার কাগজে আসামিদের বিরুদ্ধে আসলে কি ধরনের বানোয়াট কাল্পনিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, সেটির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ স্পষ্টভাবে সামনে এলে এই বিষাক্ত ঘটনার পেছনের অন্ধকার রহস্য আরও পরিষ্কার হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বিজ্ঞ মহল। তবুও বর্তমান পরিস্থিতিতে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী আতর আলীর এই তাণ্ডবে ঘাটাইল উপজেলার সাধারণ নাগরিকদের মনে চরম হতাশা, গভীর আতঙ্ক ও তীব্র মানসিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মামলাবাজ এই আতর আলীর অপকর্মের মাত্রা আজ নতুন নয়। তার দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হিংস্রতা ও বেপরোয়া ভূমিলুণ্ঠনে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে গত বছরের ১ আগস্ট এলাকাবাসী এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ প্রশাসন অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী আতর আলীকে গ্রেফতার করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও পরিতাপের বিষয় হলো আইনি ফাঁকফোকর গলে জামিনে মুক্ত হয়ে আসার পর আতর আলী শুধরে যাওয়ার পরিবর্তে আরও কয়েক গুণ বেশি হিংস্র, আগ্রাসী ও চরম বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেন। কারাগার থেকে বেরিয়েই তিনি প্রতিবাদীদের ওপর দ্বিগুণ আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ ও বিশিষ্ট জনদের নানাভাবে হুমকি-ধামকি দিতে থাকেন।
জামিনে মুক্ত হয়ে এসেই তিনি প্রকাশ্য দিবালোকে এলাকায় ঘুরে ঘুরে হুঙ্কার দিচ্ছেন এবং ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চরম ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছেন, যা পুরো ঘাটাইলে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের জন্ম দিয়েছে। আতর আলীর লাগামহীন অত্যাচার, ভিটেমাটি দখল এবং আইনি হয়রানির হাত থেকে বাঁচতে ও জবরদখল হওয়া নিজেদের পৈতৃক জমিজমা ফেরত পেতে স্থানীয় ছয়ানী বকশিয়া বাজারে সকাল ৯টায় এক বিশাল গণপ্রতিবাদ ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এই কর্মসূচিতে বকশিয়া, আথাইল শিমুল, বীরসিংহ, দশানী বকশিয়া ও আশপাশের গ্রামগুলোর শত শত ভীতিগ্রস্ত অথচ সংকল্পবদ্ধ জনতা এসে উপস্থিত হন এবং সংহতি প্রকাশ করেন। উক্ত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভায় ভুক্তভোগীরা আক্ষেপের সাথে জানান যে, আতর আলী কেবল জমি কেড়েই ক্ষান্ত হননি, বরং যাদের জমি জবরদখল করেছেন তাদেরই নামে উল্টো মিথ্যে মামলা ঠুকে দিয়ে পরিবারগুলোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। মানববন্ধনে উপস্থিত ভূতের মতো তাড়া করা ভুক্তভোগীরা আকুল আকুতি জানিয়ে অবিলম্বে তাদের নিজস্ব জমি ফেরত পাওয়ার দাবি জানান এবং একই সাথে প্রতিবাদকারীদের নামে করা সমস্ত মিথ্যে ও হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জোর দাবি তোলেন।
উক্ত জনসামাবেশে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও ছয়ানী বকশিয়া গ্রামের কৃতী সন্তান মো. শাহজাহান আলীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও পরিচালনায় একঝাঁক প্রবীণ ও সম্মানিত ব্যক্তি তাদের ক্ষোভ ও ক্ষুরধার বক্তব্য তুলে ধরেন। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফরমান আলী খান, এলাকার শ্রদ্ধেয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান তালুকদার, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য জাফর আলী, বিশিষ্ট সমাজসেবক মোজাম্মেল হোসেন তুলা, মধুপুর দারিদ্র্য বিমোচন কর্মকর্তা কামরুল হাসান, স্থানীয় প্রতিনিধি ফরিদ খান, জিয়াউর রহমান জিয়া ও রনি তালুকদারসহ অঞ্চলের অন্যান্য গণ্যমান্য ও সুশীল ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে কুখ্যাত ভূমিদস্যু, বিপজ্জনক সন্ত্রাসী ও মামলাবাজ আতাউর রহমান ওরফে আতর আলীর দীর্ঘদিনের অন্ধকার সাম্রাজ্য, অবৈধ জমি দখল এবং যার-তার নামে যখন-তখন মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়েরের জঘন্য চক্রান্ত বিশদভাবে তুলে ধরেন। তারা স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়ে বলেন যে, ঘাটাইলকে একজন আতর আলীর মতো অপরাধীর আখড়া বানাতে দেওয়া হবে না। অনতিবিলম্বে তাকে গ্রেফতার করে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্থায়ীভাবে বন্দি করতে হবে এবং গ্রামের সাধারণ মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা ও তাদের স্থাবর সম্পত্তি ফিরিয়ে দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবিলম্বে কঠোর ও আপসহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সর্বস্তরের মানুষের এই ঐতিহাসিক প্রতিবাদ সভা এটিই প্রমাণ করে যে, ঘাটাইলের মাটি কোনো ভূমিদস্যু বা সন্ত্রাসীর চারণভূমি হতে পারে না এবং বিচারপ্রার্থী জনগণ তাদের হারিয়ে যাওয়া অধিকার ফিরে পেতে ও আতর আলীর মতো মামলাবাজকে আইনের খাঁচায় বন্দি দেখতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।