
লালমনিরহাট প্রতিনিধি
“অমুক ভাই যোগ্য লোক, জয়ের মালা তারই হোক” চারিদিকে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। চলছে জনসভা, মিটিং ও মিছিল। বাড়ি বাড়ি গিয়ে নির্বাচনী লিফলেট বিতরণ। কিন্তু বিতরণ হচ্ছে না চাল, ডাল কিংবা শীতবস্ত্র। একদিকে নির্বাচনী উত্তাপ, অন্যদিকে শীতার্ত মানুষের আহাজারি। লালমনিরহাট সীমান্তবর্তী জেলা এবং হিমালয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় প্রতি বছর এখানে শীতের প্রাদুর্ভাব থাকে একটু বেশি। উত্তরের এই জেলাতে অভাব-অনটন একটু বেশী। তার উপর গত তিনদিন ধরে চলছে মৃদু শৈত্য প্রবাহ। হতদরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছেন বিপাকে।
অপরদিকে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার প্রচারণার সুযোগ আছে আর মাত্র চারদিন। চারদিকে পোস্টার ব্যানার, মাইকিং, মিছিল মিটিং, করমর্দন, জনসংযোগ। গোটা জেলার আনাচে-কানাচে চলছে প্রার্থী আর তাঁদের সমর্থকদের দৌড়ঝাঁপ। নির্বাচনের এই ডামাডোলে পড়ে হতদরিদ্র ছিন্নমূল খেটে খাওয়া শীতার্ত মানুষের খোঁজ কেউ রাখছেন না। জনপ্রতিনিধি হওয়ার দৌঁড়ে ঢাকা পড়েছে শীতার্ত মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশার চিত্র।
কুড়িগ্রাম (রাজারহাট) আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাট ও এর আশেপাশে গত দু-দিন আগেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে সোমবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমেছে ১১.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। চলতি সপ্তাহে এই তাপমাত্রা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির সম্ভাবনা আরো বেশি।
লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনে সোমবার মধ্যরাতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে- ৫০ থেকে ৬০জন ছিন্নমূল মানুষ প্লাটফর্মের বিভিন্ন স্থানে পাকা বারান্দাসহ বসার স্থানগুলোতে কোনো রকমে একটা কাঁথা বা পাতলা কম্বল মুড়ি দিয়ে রাত যাপনের আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। জীবিকার তাগিদে নানা স্থানে ঘুরে বেড়ানো এসব হতদরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, তাঁরা এই সারিবদ্ধভাবে স্টেশনের প্লাটফর্মে শুয়ে আছেন।
তাদের একজন বয়স্ক ষাটোর্ধ নজরুল মিয়া জানান- পুত্র সন্তান না থাকায় এখানে সেখানে ভিক্ষে করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তিনি জানান- গত এক সপ্তাহ ধরে এখানে রাত কাটাচ্ছেন। দিনভর ভিক্ষে করেন। পরে রাতে খেয়ে দু’নম্বর প্ল্যাটফর্মের যাত্রী ছাউনির নিচে মাটিতে শুয়ে পড়েন। ঠান্ডার কারণে ঠিক মতো ঘুম হয় না। তার গায়ে একখানা কম্বল আর মাটিতে বিছানো একখানা চাদর। তিনি বলেন- এভাবেই দিন পার হচ্ছে। কেউ দেখে না।
তার পাশেই শুয়ে থাকা আরেক বৃদ্ধ করিম উদ্দিন(৬৫) জানান- ভিটেমাটি বলতে কিছুই নেই। কখনো স্টেশনে, কখনো বড় কোন স্কুলের বারান্দায় শুয়ে তার রাত কাটে। গরমের দিনগুলোই মশার কামড়ে রাত কাটলেও শীতের রাতগুলো নিদারুণ কষ্টে পার করতে হয়। জানতে চাই, কেউ ভোট চাইতে এসেছিল কি-না? তিনি হেসে বললেন- “হামার কাছোত কায়ো ভোট চায় নাই। হামার ভোট দিয়া কি লাভ! হামার খবর কায়ো নেয় না”।
পৌষের দাপটে তাপমাত্রার পারদ ক্রমাগত নামছে। ঠান্ডার প্রকোপে ছিন্নমূল হতদরিদ্র মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। অথচ নির্বাচনের উত্তাপে এ বছর লালমনিরহাটের সেই শীতার্তরা এভাবেই উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্যাহ এই প্রতিবেদককে বলেন- উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে জেলার পাঁচটি উপজেলার জন্য ২০ হাজার কম্বল ইতোমধ্যেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর কিছু কম্বল বিতরণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা সচেষ্ট আছি।