
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে একটি প্রভাবশালী মহলের নেতৃত্বে তিস্তা নদীর চর ও কৃষি জমির মাটি ও বালু লুটের মহোৎসব চলছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অবাধে এসব বালু-মাটি বিক্রি করা হলেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের তেলির বাজারের গয়িং বাঁধ সংলগ্ন নদীর চর ও আশপাশের ফসলি জমি থেকে দিনরাত মাটি ও বালু কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী জামিনুর রহমান, আতাউর, নুর ইসলাম, তালেব, ওয়াজেদ, স্বপন ও হানিফসহ কয়েকজন। এছাড়াও টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ঠিক পেছনেই আঃ করিম নামে এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে ইঞ্জিনচালিত বোমা মেশিনের সাহায্যে পুকুর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অভিযুক্তরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। এমনকি মাঝেমধ্যে প্রশাসন অভিযান চালালে উল্টো প্রশাসনের বিরুদ্ধেই স্লোগান দেয় এই বালুখেকো চক্রটি। শুধু টেপাখড়িবাড়ি নয়, উপজেলার খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, খগাখড়িবাড়ি, পূর্ব ও পশ্চিম ছাতনাই এবং নাউতারা ইউনিয়নেও একই চিত্র দেখা গেছে।
প্রতিদিন ১০ থেকে ১২টি ভারী ট্রাক্টর-ট্রলি যাতায়াতের কারণে গ্রামীন কাঁচা-পাকা রাস্তাগুলো বড় বড় গর্ত ও খানাখন্দে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে ধুলোবালিতে পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে থাকে, আর বর্ষায় এসব রাস্তা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। বালুবাহী গাড়ির বিকট শব্দ এবং ধুলার কারণে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ট্রাক্টরগুলো মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাচ্চাদের স্কুলে পাঠিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয়। ট্রাক্টরের বেপরোয়া গতির কারণে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।” শিক্ষার্থীরা জানায়, ধুলার কারণে তাদের পোশাক নষ্ট হয় এবং চোখে-মুখে বালি ঢুকে অসুস্থ হয়ে পড়তে হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষা চলমান থাকলেও বিকট শব্দে পড়াশোনা ও পরীক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে পরীক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে।
অভিযুক্তদের একজন হানিফ বালু বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করলেও জানান যে, অনেকে চর থেকে বালু নিয়ে যাচ্ছে। তবে বালু কাটার বৈধ কোনো অনুমতি আছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ট্রাক্টর চালকরা জানান, তারা দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন এবং মহাজনের নির্দেশেই বালু পরিবহন করেন।
ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা বিষয়টির দায় এড়িয়ে বলেন, “আমি লোক পাঠিয়েছি এবং বিষয়টি ইউএনও স্যারকে জানিয়েছি।”
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান বলেন, “নদী বা ফসলি জমি থেকে বালু ও মাটি উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। ইতিপূর্বেও আমরা অভিযান চালিয়ে ট্রলি জব্দ করেছি। অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”
প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য রুখে দিয়ে কৃষি জমি এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রশাসনের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ডিমলার সচেতন নাগরিক সমাজ।