
ডিমলা (নীলফামারী) প্রতিনিধি:
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণ নিয়ে সুবিধাভোগীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত ৩০ কেজির পরিবর্তে অধিকাংশ বিক্রয়কেন্দ্রে ২৮ থেকে ২৯ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি খাদ্যগুদাম থেকে সরবরাহ করা চালের মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। বিতরণের জন্য রাখা চালে পোকা ধরা, পচা, ভাঙা, ধুলা-বালি ও ময়লা মিশ্রিত দানা রয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের বিভিন্ন ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে বিতরণের জন্য রাখা চালে সাদা, হলদে, বিবর্ণ ও কালচে বিভিন্ন বর্ণের দানা দেখা যায়। স্থানীয় কয়েকজন এসব চাল খাওয়ার অনুপযোগী বলে অভিযোগ করেন। এ সময় কোনো বিক্রয়কেন্দ্রে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে দেখা যায়নি।
উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ডিমলার ১০টি ইউনিয়নে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় মোট ২১ হাজার ৩৩৫ জন কার্ডধারী সুবিধাভোগী রয়েছেন। চলতি পর্যায়ে তাঁদের জন্য ৬৪০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির নিয়ম অনুযায়ী, কার্ডধারীরা ১৫ টাকা কেজি দরে মাসে ৩০ কেজি চাল কেনার সুযোগ পান। ৩০ কেজি চালের মূল্য ৪৫০ টাকা। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে উপজেলায় ৪১ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ভূমিহীন, প্রান্তিক ও স্বল্প আয়ের কৃষক, দিনমজুর, দরিদ্র ও অসহায় মানুষ, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্ত নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং নারীপ্রধান দরিদ্র পরিবারের মতো নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গত ১৬ আগস্ট থেকে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের ৪১ জন ডিলার উপজেলা সদরের খাদ্যগুদাম থেকে চাল সংগ্রহ শুরু করেন। পরে নির্ধারিত দিনে তাঁরা নিজ নিজ বিক্রয়কেন্দ্রে সুবিধাভোগীদের মধ্যে চাল বিতরণ করছেন।
সুবিধাভোগীদের অভিযোগ, ৩০ কেজির পরিবর্তে ২৮ থেকে ২৯ কেজি করে চাল দেওয়ায় প্রতি কার্ডে ১ থেকে ২ কেজি চাল কম পাচ্ছেন তাঁরা। ফলে নির্ধারিত মূল্যে পুরো পরিমাণ চাল না পাওয়ায় তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। একই সঙ্গে চালের মান নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের সুবিধাভোগী আয়েশা আক্তার, মোজাম্মেল হক, ইমান আলী, নূর হোসেন ও দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন বলেন, ‘এ ধরনের চাল আগে কখনো দেওয়া হয়নি। এবার পোকা ধরা, ধুলা-ময়লা মেশানো এবং নানা ধরনের চাল মিশ্রিত রয়েছে। এ কারণে অনেকে চাল নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। চালগুলো কেউ নিতে চায় না। এগুলো খাওয়ার অযোগ্য।’
তাঁরা আরও বলেন, ‘ইতিপূর্বে ওজন ও চালের মান নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। এবার চালের মানও খারাপ, ওজনেও কম দেওয়া হচ্ছে। আমরা ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চালের জন্য ৪৫০ টাকা দিচ্ছি। কিন্তু ডিলারের লোকজনের প্রতিনিধিরা ২৮ বা ২৯ কেজি করে চাল দিচ্ছেন। এতে আমরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
অভিযোগের বিষয়ে ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের ডিলার ছকিউদ্দিন মানিক, কনেশ্বর চন্দ্র রায় ও মনিরুজ্জামান মানিক বলেন, ‘উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে আমাদের যে চাল সরবরাহ করা হয়েছে, আমরা সেটিই সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিতরণ করছি। চালের মান নির্ধারণ বা গুদাম থেকে সরবরাহের বিষয়টি আমাদের হাতে নয়।’
অনিয়মের বিষয়টি সরেজমিনে দেখার জন্য ডিমলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মামুনার রশীদকে মুঠোফোনে ঘটনাস্থলে আসার অনুরোধ করা হলে তিনি ‘আসতেছি’ বলে জানান। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তিনি ঘটনাস্থলে আসেননি।
ডিমলা খাদ্যগুদামের খাদ্য পরিদর্শক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নবাব চাল পচা বা খাবার অনুপযোগী হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা গোডাউন থেকে ভালো চাল দিয়েছি। এছাড়া দীর্ঘদিন চাল গোডাউনে থাকলে রংয়ের একটু পরিবর্তন হতে পারে।’ পরে তিনি বলেন, ‘ভাই, অফিসে আসেন, কথা হবে।’
ডিমলা উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মামুনার রশীদ বলেন, ‘গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল সরবরাহ ও ওজনে কম দেওয়ার অভিযোগটি আমার গোচরে এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’
ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর আমি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রককে বিষয়টি জেনে ব্যবস্থা নিতে বলেছি।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) সৈয়দ আতিকুল হক বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’