
ভোরের বাংলা নিউজ ডেস্ক
নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেশে ফেরার আগেই প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থপাচারের অভিযোগে কাঠমান্ডু জেলা আদালত তার ও তার স্ত্রী সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরজু রানা দেউবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও গত ২৫ মে সুপ্রিম কোর্ট ওই পরোয়ানার কার্যকারিতা বাতিল করে তাদের গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেন।
দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার প্রায় পাঁচ মাস বিদেশে থাকার পর নেপালে ফিরেছেন ৮০ বছর বয়সী দেউবা। চিকিৎসার জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে দেশ ছাড়ার পর তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন। দেশে ফেরার পর তাকে ঘিরে আবারও সরব হয়েছে নেপালের রাজনীতি। একই সঙ্গে নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিরোধ এবং তার বিরুদ্ধে চলমান অর্থপাচার তদন্তও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
দেউবার বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্ত শুরু করেছিল দেশটির অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ। গত ৮ এপ্রিল কাঠমান্ডু জেলা আদালত ওই বিভাগের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দেউবা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। সে সময় তারা দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন।
তবে দেউবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি মহেশ শর্মা পৌডেল ও নিত্যানন্দ পাণ্ডের বেঞ্চ তাদের গ্রেপ্তার না করার অন্তর্বর্তী আদেশ দেন। আদালত বলেন, অর্থপাচার তদন্ত বিভাগের তদন্তাধীন অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার বিশেষ আদালতের। ফলে কাঠমান্ডু জেলা আদালতের জারি করা পরোয়ানা কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
আদালত আরও বলেন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া ও কারণ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। কাউকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন, প্রমাণ নষ্ট করতে পারেন কিংবা তদন্তে বাধা সৃষ্টি করতে পারেন এমন যুক্তিসংগত ভিত্তি থাকা প্রয়োজন। দেউবা দম্পতির ক্ষেত্রে এমন ভিত্তি যথেষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলেও আদালত উল্লেখ করেন।
এদিকে দেউবা ও তার স্ত্রী অর্থপাচার তদন্তে সহযোগিতা করার কথা আগেই জানিয়েছিলেন। জুনে তারা অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ ও বিশেষ আদালতে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, তারা দেশে ফিরে তদন্তে সহযোগিতা করবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি না করার অনুরোধ করেছিলেন। তারা ১৩ আগস্টের মধ্যে দেশে ফেরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
এরই মধ্যে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরেন দেউবা। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে শত শত সমর্থক তাকে স্বাগত জানান। হাত নেড়ে ও হাসিমুখে সমর্থকদের অভিবাদন জানান তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় তার নিরাপত্তায় বিমানবন্দর ও পরবর্তী সমাবেশে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র অভি নারায়ণ কাফলে বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় দেউবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাটি অর্থপাচার তদন্ত বিভাগ পরিচালনা করছে।
দেশে ফিরেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন দেউবা। নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিরোধের মধ্যেই তার ঘনিষ্ঠ নেতারা তাকে আবার দলের সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে তার নেতৃত্বে পঞ্চদশ সাধারণ অধিবেশন আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্ট গত ১৭ এপ্রিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করার পর দেউবা শিবিরের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়। ওই রায়ে গগন থাপার নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস কমিটিকে দলের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
দেউবার ঘনিষ্ঠ নেতা প্রকাশ শরণ মহাত বলেন, তাদের সামনে দুটি পথ খোলা রয়েছে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করা অথবা দেউবার নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তার অধীনেই সাধারণ অধিবেশন আয়োজন করা।
মহাত বলেন, স্বাভাবিকভাবেই শের বাহাদুর দেউবারই পঞ্চদশ সাধারণ অধিবেশন পরিচালনা করা উচিত। এখন সুপ্রিম কোর্ট আগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে সম্মত হওয়ায় অন্য পক্ষ দেউবার নেতৃত্বে সাধারণ অধিবেশন করতে রাজি হলে চূড়ান্ত রায়ের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
দেউবার নেতৃত্বে দলের বিরোধী পক্ষগুলোকে একত্র করা সম্ভব বলেও দাবি করেন তিনি। তার মতে, দেউবার নেতৃত্বে সবাই একসঙ্গে আসতে পারেন। কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া বা কাউকে বাদ দেওয়ার প্রশ্ন থাকবে না।
তবে দেউবাকে আবার দলের সভাপতি হিসেবে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন নেপালি কংগ্রেসের মহাসচিব প্রদীপ পৌডেল। তিনি বলেন, বিশেষ সাধারণ অধিবেশনের বৈধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাকে আবার সভাপতি হিসেবে গ্রহণ করে সাধারণ অধিবেশনে যাওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই।
পৌডেল বলেন, দেউবা ইতোমধ্যে দুই মেয়াদে দলের সভাপতি ছিলেন। এখন তার উচিত দলীয় গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে থেকে বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকের শুরুতে দেউবার দেশে ফেরাকে স্বাগত জানান গগন থাপা। তিনি বলেন, সাবেক সভাপতি শের বাহাদুর দেউবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে তিনি দেশে ফিরেছেন এবং তাকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হচ্ছে।
নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিশেষ সাধারণ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে। সাধারণ অধিবেশনের ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিনিধি বিশেষ অধিবেশনের দাবি জানালে সেখানে গগন থাপাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। পরে নির্বাচন কমিশন থাপার নেতৃত্বাধীন কমিটিকে স্বীকৃতি দিলে দেউবা শিবির সেই সিদ্ধান্তকে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে।
গত ১৭ এপ্রিল আদালতের একটি বেঞ্চ থাপা শিবিরকে নেপালি কংগ্রেসের বৈধ নেতৃত্ব হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরে দেউবা শিবির ওই রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করে। প্রাথমিক পর্যালোচনার পর ২২ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করে। এতে দলের নেতৃত্ব নিয়ে আইনি বিরোধটি আবারও সামনে আসে।
এদিকে দেউবার সমর্থক নেতারা শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত কাঠমান্ডুর মিরাকল পার্টি ভেন্যুতে একটি সমাবেশ করছেন। ওই বৈঠক থেকে সমঝোতা নাকি বিভক্তির পথে যাওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
অর্থপাচার তদন্তও অবশ্য থেমে নেই। গত জুলাইয়ে তদন্তকারীরা বিশেষ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সেখানে দেউবার ছেলে জয়বীর দেউবার মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ২ কোটি ৬০ লাখ নেপালি রুপির একটি লেনদেনের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
তবে দেউবা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির প্রচেষ্টাও সফল হয়নি। ইন্টারপোল নেপাল কর্তৃপক্ষের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে প্রয়োজনীয় নথি ও অভিযোগের বিষয়ে আরও তথ্য চেয়েছিল।
ফলে দেশে ফেরার পর দেউবার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে চলমান অর্থপাচার তদন্তও নেপালের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এবং নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ দুটি বিষয়ই এখন দেউবার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সূত্র : দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট