
তজিবুর রহমান
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হলো বেকারত্ব। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম হলেও তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও অনেক তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে উপযুক্ত চাকরির অপেক্ষায় থাকছেন। ফলে ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক স্থিতি এবং জাতীয় অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বর্তমান সময়ে বেকারত্ব শুধু চাকরির অভাবের বিষয় নয়; এটি দক্ষতা ও কর্মবাজারের চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্যেরও প্রতিফলন। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের অনেকের দক্ষতা আধুনিক শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে চাকরির সুযোগ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না, আবার শিক্ষিত যুবকরাও কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত হন।
বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যার অন্যতম কারণ হলো শিল্পায়নের ধীরগতি। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার হার প্রত্যাশিত মাত্রায় না হওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সীমিত থাকছে। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্প ও প্রযুক্তিভিত্তিক খাতগুলোতে বিনিয়োগের ঘাটতি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও অর্থায়ন সংকট উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতেও কর্মসংস্থানের সংকট স্পষ্ট। কৃষি এখনও দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলেও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে কৃষিখাতে শ্রমের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামীণ এলাকায় শিল্প ও সেবা খাতের পর্যাপ্ত বিকাশ না হওয়ায় বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন। এর ফলে শহরে শ্রমবাজারে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বেকারত্ব আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তরুণদের মধ্যে চাকরির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক শিক্ষিত যুবক সরকারি বা নির্দিষ্ট কিছু করপোরেট চাকরিকে একমাত্র ক্যারিয়ার হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা কারিগরি পেশায় যুক্ত হওয়ার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে কম। এতে কর্মসংস্থানের বিকল্প সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই দীর্ঘ সময় বেকার থেকে যান।
বেকারত্বের সামাজিক প্রভাবও ব্যাপক। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকার ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশা, মানসিক চাপ এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক অপরাধের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। কর্মসংস্থানের অভাবে দক্ষ মানবসম্পদের একটি অংশ বিদেশমুখী হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য মেধাপাচারের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশের অর্থনীতিতেও বেকারত্বের নেতিবাচক প্রভাব সুস্পষ্ট। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ উৎপাদন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকলে জাতীয় উৎপাদন কমে যায়। একই সঙ্গে ভোগক্ষমতা হ্রাস পায়, যার ফলে বাজারে চাহিদা সংকুচিত হয়। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অপরিহার্য।
নারী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এখনও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অনেক শিক্ষিত নারী সামাজিক বাধা, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে শ্রমবাজারে পূর্ণাঙ্গভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না। ফলে দেশের মানবসম্পদের একটি বড় অংশের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বেকারত্ব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। শুধু সনদ অর্জনের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা দক্ষতা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস প্রয়োজন। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তৃতীয়ত, উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ সেবা নিশ্চিত করা গেলে তারা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত হবে। এতে শুধু নিজেদের কর্মসংস্থানই নয়, অন্যদের জন্যও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চতুর্থত, তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরি করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
সবশেষে, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র উদ্যোগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে শহরমুখী জনস্রোত কমানো সম্ভব। এতে আঞ্চলিক বৈষম্যও হ্রাস পাবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা একটি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ, যা অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। তবে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এই সংকট অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সময়োপযোগী নীতি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করে টেকসই উন্নয়নের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে।