
নাহিদা হাসান দীপা,রংপুর
বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিচিত। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি একটি নীরব সংকটও ক্রমশ গভীর হচ্ছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সেই সংকট হলো মেধাপাচার বা ব্রেইন ড্রেইন। উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ এবং প্রতিভাবান জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ উন্নত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং জীবনমানের আশায় বিদেশে চলে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে দেশে ফিরে না এসে বিদেশেই স্থায়ীভাবে বসবাস ও কর্মজীবন গড়ে তুলছেন। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
মেধাপাচার বলতে এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে কোনো দেশের উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ এবং পেশাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উন্নত সুযোগ-সুবিধার সন্ধানে অন্য দেশে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে কাজ করেন। সাধারণত গবেষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবীরা এই প্রবণতার সঙ্গে বেশি জড়িত থাকেন। বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বিস্তার এবং উন্নত দেশগুলোর দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বৃদ্ধির ফলে মেধাপাচার একটি বৈশ্বিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। UNESCO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৬০০ জন। কিন্তু ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৪৯ হাজারে পৌঁছায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ হাজারেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মেধাপাচারের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো উন্নত কর্মসংস্থানের সুযোগ।বাংলাদেশের অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী দীর্ঘ সময় চাকরির জন্য অপেক্ষা করেন। অনেক ক্ষেত্রে চাকরি পেলেও তাদের দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে
সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন এবং কর্মপরিবেশ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো উচ্চ বেতন, আধুনিক প্রযুক্তি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ প্রদান করে। ফলে বিদেশে কর্মজীবন গড়ে তোলার আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের সীমিত সুযোগও মেধাপাচারের একটি বড় কারণ। বর্তমান বিশ্বে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগে গবেষণার গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু বাংলাদেশে
গবেষণা খাতে বরাদ্দ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক গবেষণাগার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক
সহযোগিতার সুযোগ সীমিত। ফলে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে আগ্রহী হন। সেখানে তারা উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক মানের কাজের পরিবেশ পান।
মেধাপাচারের পেছনে সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার মান অনেক মানুষকে বিদেশমুখী করে তোলে। বিশেষ করে যেসব পরিবার তাদের সন্তানদের জন্য উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়, তারা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হয়। এছাড়া রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং পেশাগত স্বাধীনতার মতো বিষয়ও বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক দিল আফরোজা বেগম এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন যে, অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে যেতে আগ্রহী হন কারণ তারা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ খুঁজে থাকেন। তার মতে, দেশীয় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা গেলে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা কিছুটা কমানো সম্ভব।
মেধাপাচারের প্রভাব দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের ওপর বহুমাত্রিকভাবে পড়ে। একজন দক্ষ চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা গবেষক তৈরি করতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ করতে হয়। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সরকার এবং সমাজ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন সেই ব্যক্তি বিদেশে চলে যান, তখন তার জ্ঞান ও দক্ষতার সুফল অন্য দেশ ভোগ করে। ফলে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে, তার প্রত্যাশিত ফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত
মেধাপাচারের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হতে পারে। প্রতিবছর বহু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য যান। এর ফলে দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়।শিক্ষা ও গবেষণা খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দক্ষ শিক্ষক ও গবেষকের সংখ্যা কমে গেলে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গবেষণার পরিমাণ এবং মান উভয়ই কমে যেতে পারে। একটি দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণা, উদ্ভাবন এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মেধাপাচার দীর্ঘমেয়াদে দেশের
প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
তবে মেধাপাচারের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IOM)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি ছিল। এই অর্থ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এছাড়া বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি পেশাজীবীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করছেন।
বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ “ব্রেইন ড্রেইন” এর পরিবর্তে “ব্রেইন সার্কুলেশন” ধারণার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর অর্থ হলো বিদেশে অবস্থানরত মেধাবীরা যদি তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করেন, তাহলে বিদেশে চলে যাওয়াও সম্পূর্ণ ক্ষতিকর নাও হতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগ অনেক বেড়েছে। ফলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি গবেষক ও পেশাজীবীদের দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
মেধাপাচার কমাতে হলে প্রথমেই দেশের শিক্ষা ও গবেষণা খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং গবেষকদের জন্য প্রণোদনা বৃদ্ধি করা জরুরি। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির জন্য আকর্ষণীয় কর্মপরিবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করা গেলে অনেক তরুণ দেশেই নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবেন।এছাড়া বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর জন্য রিটার্নি ট্যালেন্ট প্রোগ্রাম চালু করেছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
মেধাপাচার বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল জনশক্তি হারানোর বিষয় নয়; বরং দেশের শিক্ষা, গবেষণা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। অন্যদিকে সঠিক নীতি, উন্নত কর্মপরিবেশ, গবেষণার সুযোগ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ তার মেধাবী জনগোষ্ঠীকে দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে সক্ষম হবে। দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে মেধাপাচারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়াই সময়ের দাবি।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর