
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: মো: সৌরভ
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ফুটপাথের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিড় কমতে শুরু করেছে। ঠিক সেই সময় ছোট্ট একটি ফুড কার্টে হালকা হলুদ আলো জ্বলে ওঠে নাম “কালাই ফ্লেভার্স & More”। দাঁড়ানো ছেলেটির চোখে ক্লান্তি থাকলেও হাসিতে যেন এক আলাদা উজ্জ্বলতা। তিনি রাসেল, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি সন্ধ্যায় এই কার্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যান তিনি।
কথা শুরুতেই হাসতে হাসতেই বললেন, “কালাই রুটি হাঁসের মাংস শহরে কে আর দেয়? মানুষের মুখে নতুন স্বাদের হাসিই আমার আসল লাভ।”
আঞ্চলিক স্বাদের প্রতি ঝোঁক
রাসেল ছোটবেলা থেকেই রাজশাহী দিনাজপুর অঞ্চলের খাবারের প্রতি টান অনুভব করতেন। বাড়িতে দাদীর হাতে তৈরি কালাই রুটি আর হাঁসের মাংস তার প্রিয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে দেখলেন, চারদিকে শুধু বার্গার, ফ্রাই, চিকেন রোল মফস্বলের ঘরোয়া খাবারের কোনো জায়গা নেই। তখনই মাথায় আসে কার্টে আঞ্চলিক খাবারের আলাদা সেটআপ করার আইডিয়া।
“ভিন্ন কিছু দিলে মানুষ আগ্রহ দেখায়। কালাই রুটি, হাঁসের মাংস, দই–চিড়া এসব দেখে অনেকেই অবাক হন। আমি চাই, উত্তরবঙ্গের আসল স্বাদ শহরের মানুষ আবার চিনুক।”
কার্টে এখন চারটি প্রধান আইটেম কালাই রুটি, হাঁসের মাংস, লেবুর পিনিক ও দই চিড়া। মাঝে মাঝে দিনাজপুরের চমচম বা রাজশাহীর কাঁচকি ভর্তা আইটেম হিসেবেও রাখা হয়।
শুরুটা সহজ ছিল না
রাসেল জানান, কার্ট কেনার টাকা মাকে বুঝিয়ে এক রকম জেদ করেই নেয়া কারণ ফুড কার্ট দেই তা চাচ্ছিলো নাহ । প্রথম দিন মাত্র পাঁচজন ক্রেতা আসে। লাভ তো দূরের কথা, উপকরণের দামও উঠেনি।
“প্রথম সপ্তাহেই বুঝে গেছি এটা লাভের ব্যবসা নয়। কিন্তু মানুষ যখন নতুন স্বাদের কথা বলে, তখন মনে হয় চালিয়ে নেওয়া যায়।”
এখনও মাসে গড়ে দুই থেকে তিন হাজার টাকা লোকসান হয়। মূলত হাঁসের মাংসের দাম বেশি, আর কালাই রুটির উপকরণ সস্তা নয়। তার ওপর ছাত্রজীবনে সময় ও শ্রম সবই ব্যালান্স করতে হয়।
“ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন সবই থাকে। কিন্তু সন্ধ্যায় আমি কার্ট খুলবই। এটা আমার শখ, আর নিজস্ব কিছু করার আনন্দ আমাকে টেনে আনে।”
সন্ধ্যার কার্টে মানুষের ভিড়
রাসেলের কার্টের সামনে দাঁড়ালে একটি আলাদা পরিবেশ টের পাওয়া যায়। নরম আলো, গরম তাওয়া, পাশে ক্রেতাদের গল্প সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট আড্ডাখানা।
হাঁসের মাংসের গন্ধ ভেসে আসতেই কয়েকজন ছাত্র জড়ো হয়। একজন বলে, “ভাই, এই স্বাদ শহরে পাই না। কালাই রুটির গন্ধই আলাদা।”
রাসেল মনোযোগ দিয়ে রুটি বানাচ্ছেন। গ্লাভস পরে দক্ষ হাতে ময়দা ছড়িয়ে, তাওয়া ঘুরিয়ে, ধীরে ধীরে রুটি তুলে দিচ্ছেন। কাজ করতে করতে বললেন, “মানুষের মুখে হাসি দেখলে দিনের ক্লান্তি সব ভুলে যাই।”
পরিবারের চাপ, কিন্তু জেদের টানে এগিয়ে চলা
রাসেল স্বীকার করেন, পরিবার প্রথমে খুব সমর্থন করেনি। তারা চেয়েছিলেন তিনি শুধু পড়াশোনায় মন দিন। ফুড কার্টে সময় দিলে ব্যাচেলরদের মতো ব্যস্ততা বাড়ে, পরীক্ষার চাপও বেড়ে যায়।
“টাকা মায়ের কাছে নিয়ে দিচ্ছি, তার কোনো সমস্যা নেই। মা চায় আমি শুধু পড়াশোনায় মন দিই। তারপরও, লোকসান হলেও আমি চালিয়ে যাচ্ছি। কারণ এটা আমার শখ, নিজের কিছু করার আনন্দ আমাকে টেনে আনে।”
রাত ১০ টার দিকে দোকান গুটিয়ে মেসে ফেরেন। পরের দিনের ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট সবকিছু আবার নতুন করে শুরু। কিন্তু দোকানের প্রতি টানটা কমে না।
রাজশাহী ও দিনাজপুরের স্বাদ শহরে আনার স্বপ্ন
রাসেল চান তার কার্ট শুধু খাবারের দোকান না হয়ে, আঞ্চলিক স্বাদের ব্র্যান্ড হোক। আরও নানা আঞ্চলিক খাবার মেনুতে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।
“একদিন চাই, কার্টটা বড় হয়ে ‘কালাই কিচেন’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট হোক। যেখানে মানুষ উত্তরবঙ্গের সব খাবারের স্বাদ পাবে।”
এখনো স্বপ্নটা ছোট, কার্টটা ছোট, কিন্তু আশাবাদ তার বড়। নতুন আইটেম যোগ করতে নিয়মিত পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। ক্রেতাদের মতামত নিয়েই পরের দিনের মেনু ঠিক করেন।
লোকসান নয়, মানুষের ভালোবাসাই মূল পুঁজি
ফিচারের শেষ দিকে রাসেলকে জিজ্ঞেস করা হয় লোকসান হলেও কেন চালিয়ে যাচ্ছেন?
হেসে বললেন, “টাকা দিয়ে সব হিসাব হয় না। মানুষ রুটির গরম গন্ধ নিয়ে হাসি দিলে, সেটাই তো আসল লাভ।”
ছোট্ট কার্ট, চার-পাঁচটা খাবার, সন্ধ্যার আলো আর ভিন্ন স্বাদের প্রতি তার জেদ সব মিলে রাসেলের গল্পটি ধৈর্য আর স্বপ্নের গল্প।
লোকসান কমতে পারে বা কখনো লাভও আসতে পারে কিন্তু রাসেলের কাছে তার কার্ট এখন নিজের পরিচয়ের মতো। নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে থাকা, নিজের হাতে কিছু তৈরি করা এটাই তাকে প্রতিদিন নতুন করে পথচলায় ফিরিয়ে আনে।