
ভোরের বাংলা নিউজ ডেস্ক
রিকশা ভাড়া থেকে শুরু করে চায়ের দোকানের বিল, এমনকি দান-খয়রাত বা ভিক্ষাও দেওয়া যাবে স্মার্টফোনের মাধ্যমে। কাগুজে নোটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক লেনদেনকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে ‘বাংলা কিউআর’ পেমেন্ট ব্যবস্থার চতুর্থ ধাপ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগামী ১ নভেম্বর ২০২৬ থেকে এ ব্যবস্থা দেশজুড়ে সম্প্রসারণের কথা রয়েছে। এর ফলে রিকশাচালক, বাস কন্ডাক্টর, হকার, সবজি বিক্রেতা ও সাহায্যপ্রার্থীরাও ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে সরাসরি ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।
তৃণমূলের লেনদেনেও ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়া
বাংলাদেশ আগামী মাসের শুরুতেই নগদ বা কাগুজে মুদ্রাবিহীন আর্থিক লেনদেনের যাত্রায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করতে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বজনীন পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’-এর চতুর্থ ধাপের আনুষ্ঠানিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১ নভেম্বর থেকে দেশজুড়ে শুরু হতে যাচ্ছে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি (পিটুপি) ডিজিটাল লেনদেনের এক নতুন অধ্যায়। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক লেনদেনে কাগুজে নোটের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এই নতুন ব্যবস্থার ফলে কোনো বাণিজ্যিক মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টের প্রয়োজন হবে না। রিকশাচালক, বাস কন্ডাক্টর, হকার, সবজি বিক্রেতা কিংবা ভিক্ষুক বা সাহায্যপ্রার্থীরাও ব্যক্তিগত কিউআর কোডের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে এক মুঠোফোন অ্যাপ থেকে অন্য অ্যাপে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা আদান-প্রদান করতে পারবেন।
বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল, মেটা ও হুয়াওয়ের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যেই বাংলা কিউআরের এই সহজ ও অনন্য ওপেন-মডেলটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এত দিন বড় বড় বিপণিবিতান বা শপিং মলে কেনাকাটার বিল পরিশোধের জন্য ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু একটি দেশ তখনই সত্যিকারের ‘নগদবিহীন’ হতে পারে, যখন সমাজের প্রান্তিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষও এর সঙ্গে যুক্ত হন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণা অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে চালু হতে যাওয়া চতুর্থ ধাপটি দৈনন্দিন জীবনের সব ধরনের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক লেনদেনকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসবে।
এখন থেকে বাসের টিকিট কাটা, রাস্তার পাশের টং দোকানে ৫ টাকার এক কাপ চা খাওয়া, ফুটপাতের ভ্যান থেকে ১০ টাকার কাঁচামরিচ বা ধনেপাতা কেনা, জুতো সেলাইয়ের ২০ টাকা কিংবা সেলুনের বিল- সবকিছুই মেটানো যাবে একটি মাত্র কিউআর কোড স্ক্যান করে।
পকেটে কোনো কাগুজে নোট না নিয়েও একজন নাগরিক সহজেই সারাদিনের খুচরা খরচ সম্পন্ন করতে পারবেন।
ভাংতির অভাব ও ছেঁড়া নোটের ঝামেলা অবসান
দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম বড় অস্বস্তির নাম খুচরা টাকা বা ভাংতির অভাব। রিকশা ভাড়া, বাস ভাড়া কিংবা চায়ের দোকানে প্রায়ই ‘ভাংতি নাই’ বলে বিক্রেতার দীর্ঘশ্বাস বা বাড়তি টাকা রেখে দেওয়ার ঝামেলায় পড়তে হয়। বাংলা কিউআর এই সমস্যার প্রযুক্তিগত সমাধান দিতে পারে।
বিল যদি ঠিক ২৩ টাকা কিংবা ৪৭ টাকাও হয়, তবে কোনো রাউন্ড ফিগার দিতে হবে না; অ্যাপে ঠিক নির্দিষ্ট অঙ্কটাই পাঠানো যাবে। এর ফলে ২ বা ৩ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে থাকার ঝামেলা যেমন দূর হবে, তেমনি বাজারে থাকা ছেঁড়া ও নোংরা নোট আদান-প্রদানের চিরচেনা বিড়ম্বনা থেকেও মুক্তি মিলবে।
ডিজিটাল দান ও ভিক্ষার সুযোগ
নগদবিহীন লেনদেনের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে চতুর্থ ধাপে অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তনের বড় উদাহরণ হতে যাচ্ছে ডিজিটাল দান বা ভিক্ষার ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে রাস্তায় কিংবা ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে খুচরা টাকা না থাকার অজুহাতে কাউকে সাহায্য না করে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতিও কমতে পারে।
একজন সাহায্যপ্রার্থী বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের মোবাইল আর্থিক সেবার ব্যক্তিগত বাংলা কিউআর কোডটি সামনে রাখলে সাহায্যকারী ২ টাকা, ৫ টাকা বা ১০ টাকার মতো ছোট অঙ্কও গোপন নম্বর চেপে সরাসরি পাঠিয়ে দিতে পারবেন।
তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ব্যক্তিগত কোডটি শুধু বৈধ আদান-প্রদানের জন্যই ব্যবহার করা যাবে। কেউ এটিকে অননুমোদিতভাবে টাকা তোলার (ক্যাশআউট) মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলে অ্যাকাউন্টটি তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে।
সহজ নকশা ও লেনদেনের স্বাধীনতা
গ্রাহকদের লেনদেন আরও সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সব ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার অ্যাপের নকশায় বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন অ্যাপের মূল পাতার একদম নিচে, বুড়ো আঙুলের সহজ নাগালের মধ্যে ‘বাংলা কিউআর’ আইকনটি রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, আগে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে থাকা দৈনিক ২০ হাজার টাকার লেনদেনসীমা সম্পূর্ণ তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে এখন যেকোনো পরিমাণ টাকা বিনা খরচে আদান-প্রদান করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি সরাসরি স্ক্যান করার ঝামেলা এড়াতে দূর থেকে কিউআর কোডের ছবি বা স্ক্রিনশট গ্যালারি থেকে সরাসরি অ্যাপে আপলোড করে লেনদেন সম্পন্ন করার সুবিধাও যুক্ত হচ্ছে।
লেনদেনে মাশুল শূন্য
ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভীতি থাকে অতিরিক্ত ‘সার্ভিস চার্জ’ বা মাশুল নিয়ে। এই বাধা দূর করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলা কিউআরের মাধ্যমে যেকোনো অঙ্কের লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট বা গ্রাহক—উভয়ের জন্যই লেনদেনের মাশুল সম্পূর্ণ শূন্য (০ শতাংশ) করা হয়েছে।
অর্থাৎ, রিকশাচালককে ৩০ টাকা ভাড়া পাঠালে ক্রেতার অ্যাকাউন্ট থেকে যেমন অতিরিক্ত কোনো টাকা কাটবে না, তেমনি চালকও পুরো ৩০ টাকাই পাবেন। উপরন্তু, টাকাটি কোনো ব্যাংকিং বাণিজ্যে আটকে না থেকে রিয়েল-টাইমে তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রেতা বা চালকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়ে যাবে।
পরিসংখ্যানে লেনদেনের প্রবৃদ্ধি
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেলটির সাফল্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুনে যেখানে দৈনিক গড় লেনদেন ছিল মাত্র ৩৭ কোটি টাকা, সেপ্টেম্বর শেষে তা চার গুণেরও বেশি বেড়ে প্রতিদিন গড়ে ১৪৩ কোটি থেকে ১৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর চালু রয়েছে, যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য, সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই দৈনিক লেনদেনকে খুব দ্রুত ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা।
নিরাপত্তা ও সাইবার সচেতনতায় যা মানতে হবে
প্রযুক্তির অন্দরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলা কিউআর আন্তর্জাতিক ইএমভি স্ট্যান্ডার্ড মেনে তৈরি করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যবহারিক জীবনে কিছু সাইবার ঝুঁকি ও সতর্কতার বিষয়ও মনে রাখা জরুরি।
নাম যাচাই: গ্রাহকদের কোড স্ক্যান করার পর টাকা পাঠানোর আগে অ্যাপের পর্দায় চালক বা বিক্রেতার নাম মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
বার্তা: চালক বা বিক্রেতাদের উচিত যাত্রীর ফোনের পর্দার দিকে না তাকিয়ে নিজের ফোনে আসা নিশ্চিতকরণ বার্তা (এসএমএস) বা অ্যাপের ব্যালেন্স দেখে লেনদেন নিশ্চিত করা।
কাগুজে নোটে যে অর্থনীতির চাকা ঘুরত, তা আজ কাগজের ওপর মুদ্রিত একটি ছোট্ট কিউআর কোডের ফ্রেমে বন্দি হয়ে যাচ্ছে। পকেটে খুচরা টাকার খসখস শব্দ, ভাংতি না থাকার চিরচেনা বিড়ম্বনা কিংবা ছেঁড়া টাকা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত মনোমালিন্য—এসব পেছনে ফেলে বাংলাদেশ একটি আধুনিক, স্বচ্ছ ও স্মার্ট নগদবিহীন যুগের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে।
আগামী ১ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া এই নতুন অধ্যায় কেবল রিকশা ভাড়া কিংবা ভিক্ষার মতো খুচরা লেনদেনের চিরচেনা দৃশ্যপটই বদলাবে না, বরং বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে একটি আত্মনির্ভরশীল ও প্রযুক্তিগতভাবে পরিবর্তিত স্মার্ট বাংলাদেশের ভিত রচনার পথও তৈরি করবে।
সূত্র: বাসস