
বরগুনা প্রতিনিধি
তিলে তিলে নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়েছিলেন জলিল রাঢ়ী। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া সেই প্রতিষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে দুর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে। ব্যবসায়ী জালাল রাঢ়ী বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই একটি চক্র ৩ লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল। সেই টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় পরদিন তাঁর প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। ভাঙচুর, লুটপাট চালানোর পর ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। গত কয়েক দিনে জলিলের মতো বরগুনার শতাধিক ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তাদের অনেকেই সব হারিয়ে পথে বসেছেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে এমন আরও ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
জলিল রাঢ়ীর ইট, বালু ও রড-সিমেন্টের দোকানটি বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার নিউপাড়া বাজারে। ৬ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে হামলার সময় সেখান থেকে লুট করা হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন জলিল রাঢ়ী। একই সময় লুটপাটের শিকার হয় তাঁর বড় ভাই ইউনুচ রাঢ়ীর মালিকানাধীন আইসক্রিম ফ্যাক্টরিও।
রবিবার বরগুনা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান জলিল রাঢ়ী। তিনি এদিন ১১ জনের নাম উল্লেখ করেন এবং ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে বরগুনা দ্রুত বিচার আদালতে মামলা করেছেন। বিচারক এম শরিয়াত উল্লাহ্ তা আমলে নিয়ে তালতলী থানাকে এজাহারের নির্দেশ দেন। ওই মামলার আসামিরা হলেন– তালতলী উপজেলার পশ্চিম ঝাড়াখালী এলাকার বারেক হাওলাদার, সুলাইমান হাওলাদার, এনায়েত হাওলাদার, নাহিদ হাওলাদার, তৈয়ব হাওলাদার, তালেব হাওলাদার, সালেক হাওলাদার, মো. আশ্রাফুল, জাকির মোল্লা, সাগর মৃধা, রাসেল হাওলাদার। অভিযুক্ত এনায়েত হাওলাদার নিজেকে যুবদলের কর্মী দাবি করে বলেন, ‘এ ঘটনায় আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে।’ তিনি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।
সরকার পতনের পর বরগুনায় আওয়ামী লীগ নেতাদের অফিস, বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক মাত্রায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। এর মধ্যে ৫ আগস্ট বিকেল থেকে রাতের মধ্যে বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বরগুনা-১ আসনের সাবেক সংসদ অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বাসভবন, সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর কবির, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম সরোয়ার টুকু, বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতানা নাদিরা, আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য সুভাষ চন্দ্র হাওলাদার, আমতলী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও পৌরসভার মেয়র মো. মতিয়ার রহমানসহ দলটির অর্ধশতাধিক নেতার বাসভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হামলায় তছনছ হয়েছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয়হীন শতাধিক ব্যবসায়ী এক রাতের ব্যবধানে সব হারিয়ে পথে বসেছেন। অনেকে দিশেহারা হয়ে বিচারের আশায় ঘুরছেন। তাদের অভিযোগ, ছাত্রদের আন্দোলনের ফাঁকে নির্বাচনী বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরে ফায়দা লুটেছে দুর্বৃত্তরা। এখনও আতঙ্কে দিন কাটছে জানিয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির দাবি করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
তালতলীর পঁচাকোড়ালিয়া বাজারে মুদি- মনোহরি পণ্যের দোকান রয়েছে আশ্রাব আলীর। ৫ আগস্ট রাত ১টার দিকে তাঁর দোকানে হামলা করে প্রায় ৬০ লাখ টাকার পণ্য লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগের পরই স্থানীয় কিছু সন্ত্রাসী ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। তিনি দিতে রাজি না হওয়ায় রাতে লুটের শিকার হন। হামলায় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তিদের চিনলেও তাদের নাম জানালে পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানান।
জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, ভাঙচুর-লুটপাটে তাদের কেউ জড়িত নয়। তিনি এসবে জড়িত দুর্বৃত্তদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করেন।
জেলায় কতজন ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে ও কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, এর সঠিক তথ্য মেলেনি বলে জানান বরগুনার জেলা প্রশাসক মোহা. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তদন্তের মাধ্যমে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।