
রানা ইস্কান্দার রহমান
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি
মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে মানবাধিকার রক্ষা করা। আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আদিবাসীদের মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।” “আদিবাসীদের উপর নির্যাতন হত্যা, ভূমি দখল চলতেই থাকবে? এটা তো হতে পারে না। তারা কি আন্দোলন করতে করতেই জীবন পার করবে?
সুলতানা কামাল বলেন, “আমরা উন্নয়ন চাই। যদি উন্নয়নের সুফল সব জনগোষ্ঠী সমানভাবে না পায়, যদি আদিবাসীদেরকে উচ্ছেদ হতে হয় তাহলে সেটি কিসের উন্নয়ন? দেশে প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। বিচারহীনতার কারণে এসব নির্যাতনের শিকার আদিবাসীরা কষ্ট পাচ্ছে।”
সরকারের সমালোচনা করে সুলতানা কামাল বলেন, “ক্ষমতা পেতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে বলে দাবি করলেও তারা চেতনার বাইরে গিয়ে সাঁওতাল হত্যাকারীদের সঙ্গে আপসের নীতি অনুসরণ করছে। এই সাঁওতালরা দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় বাঙালিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধে ঝাপিড়ে পড়েছিলো।
সাঁওতাল হত্যার বিচার, আসামিদের গ্রেপ্তার, গুলিতে আহত সাঁওতাল, বাড়ীঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতালদের ক্ষতিপূরণ ও সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড নির্মাণ বন্ধের দাবি জানিয়ে সমাবেশে বক্তারা বলেন, ‘যে কোন এলাকার উন্নয়নে ইপিজেড স্থাপন সেই এলাকার মানুষের জন্য অবশ্যই সুখের খবর। কিন্তু সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের বাপ-দাদার জমিতে সেখানকার ওয়ারিশগণের সাথে কোন ধরনের স্বাধীন, পূর্বাবহিত সম্মতি ছাড়াই ইপিজেড স্থাপনের ঘোষণা আদিবাসী-বাঙালি জনগণকে হতাশ করেছে।’
গত সোমবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটামোড় এলাকায় আয়োজিত সাঁওতাল সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন।
গত সোববার সকাল থেকে নানান আয়োজনে গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সকাল নয়টায় সাঁওতালপল্লি মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম থেকে তির-ধনুক, ব্যানার, বিভিন্ন দাবিদাওয়া সংবলিত ফেস্টুন নিয়ে একটি মিছিল বের হয়। মিছিলটি ১০ কিলোমিটার পথ প্রদক্ষিণ করে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর সড়কের কাটামোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে বেলা সাড়ে ১১টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের শুরুতে শহীদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর প্রতিবাদী সংগীত পরিবেশিত হয়।
সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভ‚মি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জনউদ্যোগ, আদিবাসী-বাঙালী সংহতি পরিষদ, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদ, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও কাপেং ফাউন্ডেশনের যৌথভাবে এসব কর্মস‚চি পালন করে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভ‚মি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে। বক্তব্য দেন মানবাধিকার কর্মী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, এএলআরডির প্রধান নির্বাহী ভূমি অধিকার কর্মী শামসুল হুদা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ, আদিবাসী বাঙালি সংহতি পরিষদের আহবায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রফিক আহম্মেদ সিরাজী, নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগের সদস্যসচিব প্রবীর চক্রবর্তী, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিচিত্রা তির্কী, আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পষিদের সদর উপজেলা শাখার আহবায়ক গোলাম রব্বানী মুসা, গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক জাহাঙ্গীর কবীর তনু, আদিবাসী নেতা সুফল হেমব্রম, প্রিসিলা মুর্মু, সন্ধ্যা মালো, গৌড়চন্দ্র পাহাড়ী প্রমুখ।
বক্তারা বাগদা ফার্মের তিন ফসলি জমিতে ইপিজেড স্থাপনের প্রক্রিয়া বন্ধ করে জেলার অনত্র করা, চাষাবাদরত সাঁওতাল-বাঙালিদের সেচ সুবিধার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান, সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি করেন।
সভাপতি ফিলিমন বাস্কে বলেন সুসংগঠিত সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের আন্দোলন সংগ্রাম ব্যহত করতে কিছু মহল নানান ধরনের সমস্যা ও ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টির অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মানুষ আদিবাসীদের ভয় ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করছে এবং বহিরাগত প্রভাবশালী বাঙালিদের টাকার বিনিময়ে লিজ দিচ্ছে। এছাড়াও আন্দোলনে থাকা সদস্যদের সেচের যন্ত্রপাতি (ট্রান্সফরমার, মিটার, স্যালো মেশিন ও যন্ত্রাংশ) সংঘবদ্ধভাবে চুরি করছে যাতে সেচ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়। ২০১৬ সালের আসামিরা আবারও ,হুমকি ধামকি দিয়ে প্রকৃত সদস্যদের বিতাড়িত করার পায়তারা চালাচ্ছে।