
গৌরব আর সাফল্যের ১৮ বছর পার করে ১৯ বছরে পা দিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় (জাককানইবি)। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহের ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের যে বট গাছের নিচে বাঁশি বাজাতেন সেই বটতলার কাছেই ২০০৬ সালের ৯ মে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। মঙ্গলবার (৯ মে) সকালে নতুন কলাভবনের সামনে পায়রা অবমুক্তকরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় পরবর্তীতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অংশগ্রহণে একটি বর্ণাঢ্য আনন্দ শোভাযাত্রা করা হয়।শোভাযাত্রা শেষে আলোচনা সভা করা হয়।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার শিক্ষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক তথা সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। বিজ্ঞানমুখী শিক্ষার প্রসার, দেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, জ্ঞান চর্চা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পঠন-পাঠন ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করেছে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়।
২০ একর আয়তন নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনুষ্ঠানিকভাবে পাঠদান শুরু হয় ২০০৭ সালে ৩ জুন। প্রতিষ্ঠাকালীন অনুষদ ছিল ২টি ও বিভাগ ছিল ৪টি। এর মধ্যে কলা অনুষদের বিভাগ ছিল-বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ এবং সংগীত বিভাগ। বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের অধীনে ছিল- কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। উদ্বোধনী ব্যাচে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮৫ জন।
কাজী নজরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘ভেঙে যে গড়তে জানে, সে চিরসুন্দর।’ এখানে সব ভেঙে গড়তে হচ্ছে। যারা গবেষণার ক্ষেত্রে বিমুখ ছিলেন, তাদের গবেষণায় আনতে হচ্ছে। তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় হচ্ছে, আমরা গবেষণায় শিক্ষকদের যথেষ্ট সমর্থন পাচ্ছি। প্রথমবারের মতো আমরা আয়োজন করেছি গবেষণা মেলা। ইতোমধ্যে আমরা দুটো আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করেছি, যেখানে দেশ-বিদেশের বিদগ্ধ গবেষকরা অংশগ্রহণ করেছেন। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য আমাদের এই অগ্রযাত্রা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য প্রতিবছর এ ধরনের আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হবে। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্যাম্পাসকে ধারণ করতে হবে। আমরা প্রত্যেকে শুধু যার যার যে কাজ, সেই কাজটুকু ঠিকভাবে করলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যাব, যোগ করেন উপাচার্য।
শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য বিশ্বের বেশ ক’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ২০১৮ সালের জুনে, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ইরানের ফেরদৌসী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মারা অন্যতম। এছাড়াও ভারতের আসানসোলের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে নজরুলকে নিয়ে নির্মোহ গবেষণার উদ্দেশ্যে গবেষণা পত্রিকা প্রকাশ করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ বছর প্রথমবারের মতো আয়োজিত হয়েছে গবেষণা মেলা। গত বছর আয়োজিত হয়েছে কলা ও মানববিদ্যার ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর সৌমিত্র শেখর।
বর্তমান সময়ে ক্যাম্পাসে চলছে উন্নয়নের সুবিশাল কর্মকাণ্ড। একদিকে যেমন একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে চলছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন, মসজিদ, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি), সম্প্রসারিত মেডিকেল সেন্টার ও দ্বিতীয় প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের কাজ। ক্যাম্পাসের সুরক্ষার জন্য সীমানাপ্রাচীর যেমন নির্মাণ করা হচ্ছে তেমনি পুরো ক্যাম্পাসকে সিসিটিভির আওতায় আনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার। সেশনজট মুক্ত করতে ও একাডেমিক কার্যক্রমে গতি ফেরাতে শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করা হয়েছে।
১৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর সৌমিত্র শেখর বলেন, ‘শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন- এটিকে মোটো করে আমাদের অভিযাত্রা চলমান। আমরা মনে করি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে উপাদানগুলো প্রয়োজন, সেগুলো ইতিমধ্যেই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হয়েছে। এখন সেটিকে বিকশিত করার পালা। আমি সেই বিকশিত করার ক্ষেত্রে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানাই। সম্মিলিতভাবে কাজ করতে পারলে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সব দিক থেকে বিশ্বমানের করা সম্ভব। আগামীতে এটিই আমাদের প্রত্যয়। আমাদের টুইন ক্যাম্পাসের স্বপ্ন রয়েছে। আশা করি সেটিও বাস্তবায়িত হবে।’