
ধামইরহাট প্রতিনিধিঃ বাংলাদেশের বরেন্দ্র জনপদের ঐতিহাসিক জনপদ নওগাঁ জেলার গুরুত্বপূর্ণ একটি উপজেলা হলো ধামইরহাট। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের দারুন এক মেলবন্ধনের সুতোয় গাঁথা এই উপজেলাটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ শান্তিপূর্ণ এলাকা হিসেবেও সুনাম রয়েছে ধামইরহাটের ।
১৯৮৬-৮৮ সালের নির্বাচনে এলাকাটি জাতীয় পার্টির দখলে থাকলেও ‘৯১ দখলে নেয় আ’লীগ; পরে ১৯৯৬ সালের দুটিসহ ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে এলাকাটি পরিণত হয় বিএনপির দূর্গ হিসেবে। ভোটের রাজনীতিতে কম যায় নি জামায়াতে ইসলামীও ১৯৯১ ও ৯৬ সালের দুটি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় দলটি। পরবর্তীতে ২০০১ সাল থেকে বিএনপির সাথে রাজনৈতিক জোট গঠিত হলে আসনটি ছেড়ে দেয় জামায়াত। ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ পর্যন্ত একক আধিপত্য বিস্তার ধরে রাখতে সক্ষম হয় আ’লীগ; যদিও ২০০৮ সালের নির্বাচন ছাড়া বাকি সবগুলো ছিল চরম বিতর্কিত। এসময়ে আ’লীগ ছাড়া বাকি সবগুলো দলের কার্যক্রম ছিল একপ্রকার অবরুদ্ধ।
সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আবারো সরব হয়েছে ধামইরহাটের রাজনীতি; কিন্তু এবার আর মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে কার্যত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দলটি । ৫ই আগষ্ট সফল বিপ্লবের পর প্রকাশ্যে নেই এই উপজেলার প্রথম সারির কোন আ’লীগ নেতা। ধামইরহাট-পত্নীতলা আসনের আ’লীগের সাবেক এমপি শহীদুজ্জামান সরকার যিনি দশম জাতীয় সংসদের হুইপ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনিও নেই দৃশ্যপটে । ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে, অনেকের ধারণা আত্মগোপনে থেকে দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন সাবেক এই প্রভাবশালী সাংসদ । স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্য রাজনীতির ময়দানে নেই তারা ।
এদিকে বিভক্তির রাজনীতিতে বেশ জটিল অবস্থায় রয়েছে ধামইরহাট উপজেলা বিএনপি। দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে না থাকা এবং দলীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলে নিজ অনুসারীদের নিয়ে আলাদাভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকছেন ধামইরহাট উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী। তিনি ছাড়াও আলাদাভাবে মাঠে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক নেতা খাজা নাজিবুল্লাহ চৌধুরী, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার কে এম এস মুসাব্বির রহমান সাফি । তবে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীর দাবি এই আসনে বিএনপির সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সামসুজ্জোহা খানের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রয়েছে তৃণমূল বিএনপি। সরেজমিনে দেখা গেছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে আলাদাভাবে কর্মী সমাবেশ করে মাঠ ধরে রাখতে তৎপর রয়েছে গ্রুপগুলো। এব্যাপারে উপজেলা বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আহ্বায়ক কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জানান এভাবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বিভক্ত থাকলে স্থানীয় রাজনীতিতে বেশ মূল্য দিতে হবে দলটিকে, কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপে দ্রুত উদ্ভুত পরিস্থিতির অবসান হবে বলেও তিনি আশাবাদী।
অপরদিকে রাজনীতির মাঠে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রতিহিংসার রাজনীতির শিকার হয়ে নিঃস্ব হিন্দু জনগোষ্ঠীর পাশে থেকে ব্যাপক সুনাম কুড়িয়েছে দলটি। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ের উদ্বোধন উপলক্ষে নিয়মিত সভা-সমাবেশ করে জনগণের কাছে তাদের বক্তব্য পরিষ্কার করছে জামায়াত। ধামইরহাট উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা কামরুজ্জামানের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান জামায়াত একটি আদর্শ ভিত্তিক দল তারা ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে, উর্ধ্বতন সাংগঠনিক নির্দেশনা অনুযায়ী নানা কর্মসূচি নিয়ে আমরা মাঠে আছি। বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচন করবেন কিনা এমন প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি জানান বিএনপির সাথে জামায়াতের বর্তমানে কোন রাজনৈতিক জোট নেই যা তাদের আমিরে জামায়াত ইতিমধ্যেই জাতির সামনে পরিষ্কার করেছেন এবং বিএনপিও বিষয়টি স্বীকার করেছে। জোট না থাকলেও দেশের বৃহত্তর কল্যাণার্থে বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দলের সাথে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে বলেও জানান। তিনি আরো জানান কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ সকল স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সমাবেশ থেকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নওগাঁ জেলা পশ্চিম জামায়াতের আমির ইঞ্জিনিয়ার মোঃ এনামুল হককে এমপি প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে দেখা গেছে জামায়াতকে । বিএনপি-জামায়াতের বাইরে জাতীয় পার্টি এখনো তৎপরতা শুরু না করলেও কিছু দিন আগে অনুষ্ঠিত তাদের জেলা জাতীয় পার্টির এক সভা থেকে জেলাজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর বাইরে আর কোন রাজনৈতিক দলের আপাতত তৎপরতা নেই সীমান্তবর্তী শান্তিপ্রিয় এই এলাকাটিতে। বহুদিন পর রাজনৈতিক মাঠের হাওয়া পরিবর্তনকে বেশ উপভোগ করছেন এলাকার জনসাধারণ।
