
রুপা চক্রবর্তী
মধুমালা বালার ছোট্ট গ্ৰামটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একটি প্রত্যন্ত এলাকা । গ্ৰামের নাম চাঁদপুর, যেখানে এখনো কাঁচা রাস্তা, বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা আর সন্ধ্যার পর ঝিঁঝিঁ পোকার গান মানুষের সঙ্গী । কিন্তু এই গ্ৰামের একটি মেয়ের স্বপ্ন একদিন ছাপিয়ে যাবে এই গ্ৰামকেও – এমনটা কেউ ভাবে নি ।
মধুমালা জন্মগ্ৰহণ করেন দরিদ্র কৃষক পরিবারের চতুর্থ সন্তান হিসেবে। তাদের পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল নিত্যসঙ্গী। মধুমালার বাবা অল্প জমিতে চাষাবাদ করে কোন রকমে সংসার চালাতেন। কিন্তু বাবা মায়ের শত কষ্ট সত্বেও মধুমালার চোখে ছিল এক অন্যরকম দীপ্তি । ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখার প্রতি তার আগ্ৰহ ছিল অসীম। পরিবারের কেউ যখন বলতো ,” মেয়েদের বেশি পড়ালেখা করে কী হবে ?” তখন মধুমালার মা বলতেন,” আমার মেয়ে একদিন অনেক বড় হবে , তোমরা দেখে নিও ।”
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মধুমালা সবসময় প্রথম হতেন । কিন্তু মাধ্যমিকের সময় এসে দেখা দিল নতুন এক চ্যালেঞ্জ। গ্ৰামের স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। মধুমালা বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চেয়েছিলেন। শিক্ষক বললেন,” তোমার মেধা আছে, তোমার উচিত শহরের স্কুলে ভর্তি হওয়া।” কিন্তু শহরের পড়ার খরচ? এটা তার পরিবারের জন্য স্বপ্নের মতোই দূরের বিষয়।
এইসময় গ্ৰামের চেয়ারম্যান মধুমালার কথা শুনে এগিয়ে এলেন। তিনি তার শিক্ষা ব্যয়ের দ্বায়িত্ব নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। এরপর মধুমালা পাশের শহরের একটি ভালো স্কুলে ভর্তি হন । প্রতিদিন গ্ৰামের বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ১০ কি.মি. পথ পেরিয়ে স্কুলে যেতেন তিনি। দিনের পর দিন এই যাত্রা ক্লান্তিকর হলেও মধুমালা দমে যায়নি।
স্কুল থেকে এসেও তাকে করতে হতো সংসারের কাজ। রাতের বেলা হারিকেনের আলোয় পড়ালেখা চালিয়ে যেতেন। এসএসসি পরীক্ষায় তিনি জেলায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। তার এই সাফল্য শুধু তার পরিবারের নয় ,পুরো গ্ৰামের জন্য ছিল এক বিশাল গর্বের বিষয়। এরপর মধুমালা সরকারি স্কলারশিপ পেয়ে রাজধানীর একটি কলেজে ভর্তি হন ।
মধুমালার নতুন অধ্যায় শুরু হলো । কলেজে এসে তার লক্ষ্য আর বড় হলো -তিনি বিজ্ঞানী হতে চান। কলেজ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানে ভর্তি হন । বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন গবেষণার প্রতি তার আগ্ৰহ তাকে অনুপ্রাণিত করে আরো এগিয়ে যেতে ।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষে মধুমালা বিদেশি স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান । সেখানেই তিনি জেনেটিক্স ও ন্যানোটেকনোলজির উপর গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক জার্নালে,বর্তমানে তিনি বিশ্ববিখ্যাত গবেষণাগার নাসায় বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছেন।
চাঁদপুরের সেই মধুমালা এখন শুধুই গ্ৰাম কিংবা দেশ নয় সারা বিশ্বে পরিচিত। তবে এতো দূর এসেও তিনি ভোলেননি নিজের শেকড় । প্রতিবছর ছুটিতে দেশে ফিরে গ্ৰামের মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটান । তিনি বলেন,”আমার গ্ৰামের মেয়েরা জানুক তারা চাইলেই অনেক বড় কিছু করতে পারে। দরিদ্রতা কোন বাঁধা নয় যদি তোমার ইচ্ছাশক্তি থাকে ।”
মধুমালার গল্প কেবল একটি গ্ৰামের মেয়ের সাফল্য নয় ,এটি সেই বার্তা দেয় যে সীমাবদ্ধতার মাঝে থেকেও স্বপ্ন দেখা যায় এবং সেই স্বপ্ন পূরণ সম্ভব। তিনি প্রমাণ করেছেন মেধা আর পরিশ্রমের সামনে দারিদ্র্য বা সামাজিক প্রতিকূলতা কিছুই নয় । আজ মধুমালার গল্প শুধু তার গ্ৰামের মানুষের নয় সারা দেশের মানুষের অনুপ্রেরণা।