
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি: মাসুদ রানা
মরিতে চাইনা আমি সুন্দর ভুবনে মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই। এ পৃথিবী থেকে কেউ চলে যেতে চায় না। কিন্তু কিছু সময় পর পর দেখি মানুষ আত্মহত্যা করছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হচ্ছে স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ তৈরি কারখানা। হাজারো শিক্ষার্থী হাজারো স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়। দেশের বেশিরভাগ মেধাবী তরুণরা ভর্তি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা জীবনের মান বুঝে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই একই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে বারবার খবর আছে একজন শিক্ষার্থী গলায় ফাঁস দিয়েছে, কেউ ছাদ থেকে লাভ দিয়েছে, কেউ বিষ পান করেছে, কেউ আত্মহত্যার আগে ফেসবুকে লিখেছে যে আমি আর পারছিনা।
এই মৃত্যু গুলো কেবল ব্যক্তিগত নয় এগুলো সামাজিক ও মানসিক আর্থিক ও পাওয়া না পাওয়ার বিষয়। পরিসংখ্যান বলছে ২০২১ সালে ৬২ জন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে । ২০২২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৮৬জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।২০২৩ সালে প্রায় ৯৮ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।২০২৪ সালের ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন যার ১৭.৭৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী । ২০২৫ সালের জগন্নাথের ৪ মাসে চারজন ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই মাসের ব্যবধান৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনার পেছনে যেসব কারণ রয়েছে
মানসিক চাপ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা, সামাজিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, সেশনজট, পরীক্ষার মানসিক চাপ—সব মিলিয়ে অনেকের মনে জন্ম নেয় তীব্র উদ্বেগ।
অনেকে পরিবারের একমাত্র আশা হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। সেই “আশার ভার” অনেক সময় মানসিকভাবে অসহনীয় হয়ে ওঠে। ফলাফল খারাপ হলে, বা কোনো বিষয়ে ব্যর্থতা এলে, তারা ভাবতে থাকে—সব শেষ।
একাকিত্ব
বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পরিবার থেকে দূরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বা মেসে থাকে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারা, বন্ধুর অভাব, অথবা হল রাজনীতি ও সিনিয়র-জুনিয়র চাপ তাদের আরও একাকী করে তোলে।
অনেকে নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না। সামাজিকভাবে “ছেলেরা কাঁদে না”, “মন খারাপ দুর্বলতা”—এই ধারণাগুলো তাদের আরও চুপ করে দেয়। সেই নীরবতা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
প্রেম, ব্যর্থতা ও সম্পর্কের ভাঙন
তরুণ বয়সে সম্পর্ক ও আবেগের জায়গা খুব গভীর। ভালোবাসার সম্পর্কে ভাঙন, প্রত্যাখ্যান, বা সামাজিক বাধা থেকে অনেক সময় আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায় শিক্ষার্থীরা।
একজন শিক্ষার্থী যখন ভাবতে শুরু করে “আমার ছাড়া কেউ নেই”, তখনই সে মানসিকভাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব
প্রত্যেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইউনিট থাকা জরুরি । যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক সেল চালু হয়েছে, কিন্তু তা কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক অনেক জায়গায় আনুষ্ঠানিক হয়ে গেছে। শিক্ষক যদি শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেন, তাহলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।
আত্মহত্যা নয়, কথা বলুন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘কথা বলা’।
যখন কেউ হতাশ, তখন একটিমাত্র মনোযোগী শ্রোতা, একটিমাত্র আশাবাদী কথা তাকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশে “কান পেতে রই” (০১৭৭৯৫৫৪৩৯১), “মনোযত্ন” (০১৮৭০৯৯৯৯২৪)–এর মতো সংগঠনগুলো বিনামূল্যে মানসিক সহায়তা দিচ্ছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা মানে কেবল একটি জীবনের অবসান নয়—এটি একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, জাতির ক্ষতি।বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার জায়গা নয়; এটি হওয়া উচিত মানসিক নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল।শিক্ষার্থী যদি মনে করে, “আমি একা নই”—তাহলেই হয়তো এই ভয়াবহ প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।