
টাংগাইল জেলা প্রতিনিধি
রাহিদ রানা
টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সন্তোষের নিকটবর্তী বিন্যাফর এলাকা যেখানে কৃষক-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিন অবস্থান ও পদচারণা করেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তার স্মৃতিবাহী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান আজ অবহেলা ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। তার ব্যবহার করা ঘর এখন অবহেলিত। এছাড়া তার নামে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৩ সালে সেটিও নড়বড়ে অবস্থা।
স্থানীয়রা জানায়,ভাসানী আমাদের অধিকার আদায়ের পথে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, তার স্মৃতিই আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত ভাসানী হুজুর অবস্থান করেছিলেন।
১৯৭০ সালের ৬ থেকে ৮ আগস্ট বন্যা সমস্যা সমাধানের দাবিতে অনশন পালন করেন ভাসানী হুজুর । অতপর সাধারণ নির্বচনে অংশ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১২ নভেম্বর (১৯৭০) পূর্ব পাকিস্তানে প্রলয়ঙ্কারী ঘুর্ণিঝড় হলে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ ব্যবস্থায় অংশ নেয়ার জন্য ন্যাপ প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন ময়দানে এক জনসভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান দাবি উত্থাপন করেন। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রদান করেন এবং ১৮ জানুয়ারি ১৯৭১ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদানের জন্য তার প্রতি আহবান জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত যান এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন। ২৫ মার্চ রাতে মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলের বিন্যাফর এলাকায় তার গৃহে অবস্থান করছিলেন। তিনি পাকিস্তান বাহিনীর দৃষ্টি এড়িয়ে টাঙ্গাইল ছেড়ে তার পিতৃভূমি সিরাজগঞ্জে চলে যান। পাকিস্তান বাহিনী তার বিন্যাফরের বাড়িটি পুড়িয়ে দেয়। মওলানা ভাসানী মোজাফ্ফর ন্যাপ নেতা সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে নৌকাযোগে ভারত সীমানা অভিমুখে রওনা হন। অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরীর সাহায্যে মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলাম ১৫/১৬ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ অতিক্রম করে আসামের ফুলবাড়ী নামক স্থানে উপস্থিত হন। পরে তাদের হলদীগঞ্জ বিএসএফ ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়া হয়। এরপর মওলানা ভাসানী ও সাইফুল ইসলামকে প্লেনে করে কলকাতায় পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং পার্ক স্ট্রিটের কোহিনুর প্যালেসের ৫তলার একটি ফ্ল্যাট তাদের অবস্থানের জন্য দেয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে মওলানা ভাসানী একটি বিবৃতি প্রদান করেন যা ভারতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া মাওলানা ভাসানী চীনের নেতা মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে তার বার্তা পাঠিয়ে তাদের অবহিত করেন যে পূর্ববঙ্গে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যাপকহারে গণহত্যা চালাচ্ছে। সেজন্য তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে অণুরোধ করেন এই মর্মে যে, তিনি যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ না করেন। উপরন্তু মওলানা ভাসানী প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবার আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল মওলানা ভাসানী সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট কাছে পাকিস্তান বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে বর্বরোচিত অত্যাচার চালাচ্ছে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অণুরোধ করেন।
৩১ মে মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ দখলদার বাহিনীর সঙ্গে জীবনমরণ সংগ্রামে লিপ্ত। তারা মাতৃভূমি রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর। তারা এই সংগ্রামে জয়লাভ করবেই।
৭ জুন মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের সব অঞ্চল আজ দশ লাখ বাঙালির রক্তে স্নাত এবং এই রক্তস্নানের মধ্য দিয়েই বাংলার স্বাধীনতা আসবে।
ভাসানী হুজুরের এই ঘরটির বিষয়ে বিন্যাফর এলাকার তাত শ্রমিক আমিনুর বলেন,ভাসানী হুজুরের এই ঘরটি বিষয়ে যতটুকু জানি তা হলো ১৯৭১ সালে দিনটি ছিলো রবিবার বিন্যাফর বাজারে হাট করতেছিলেন সবাই ঠিক ওই সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা ওই বসত ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।এরপর ২০১৩ সালে একটি নুরানি মাদরাসা স্থাপন করা হয়। এখানে প্রতিদিন বিকালে এলাকার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের কোরআন পড়ানো হয়।
স্থানীয় বৃদ্ধ আব্দুল হামিদ বলেন,বিন্যাফর অঞ্চলে ভাসানী সাহেবের বেশ কিছু স্মৃতি রয়েছে। যেগুলো সংরক্ষণ করলে নতুন প্রজন্ম তার সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারত। কিন্তু এখন দেখার কেউ নেই।
বিন্যাফরের আরিফ হোসেন বলেন, অনেকে জানেই না কোনটা ভাসানীর স্মৃতি। জায়গাগুলো ঘাসে-ঝোপে ভরে গেছে। এখানে একটা স্মৃতি চিহ্ন বা তথ্যফলক হলে মানুষ জানতে পারত।
ভাসানী হুজুরের এই ঘরটি দেখাশোনা করতো তার ভক্ত হোসেন আলী নামে একজন। তিনিও ২০১৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারিতে মারা যান। এরপর এই ঘরের পাশে তাকে সমাধি করা হয়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ছালাউদ্দিন মিয়া জানান,এলাকায় যদি ভাসানী স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে দর্শনার্থী বাড়বে, এলাকার অর্থনীতিতেও উন্নতি আসবে। কিন্তু বারবার বলার পরও কেউ পদক্ষেপ নেয়নি।
নারী উদ্যোক্তা শিরিন আক্তার বলেন,ভাসানীর মতো নেতার স্মৃতি অযত্নে পড়ে আছে এটা খুবই দুঃখের। মেয়েদের অংশগ্রহণ, শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা এসব বিষয়ে তার যে চিন্তা ছিল, তা নতুন প্রজন্ম জানার সুযোগ পাচ্ছে না।
এলাকার রিয়াদ খান বলেন, আমরা চাই প্রশাসন একটি সমন্বিত পরিকল্পনা নিক ভাসানীর বৈঠকস্থল, চারণ ভূমি ও ঐতিহাসিক পথগুলো সংরক্ষণ করুক।
এই বর্ষিয়ান রাজনীতিবীদ মজলুম জননেতা ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই দেশ বরেণ্য নেতা মৃত্যুবরণ করেন। তাকে টাংগাইলের সদর উপজেলার সন্তোষে পীর শাহজামান দীঘির পাশে সমাধিস্থ করা হয়। সারা দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মানুষ তার জানাযায় অংশগ্রহণ করে। আজ সোমবার ভাসানী হুজুরের মাজারে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হবে তার মৃত্যু বার্ষিকী। শ্রদ্ধা জানাবেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও পরিবারের লোকজন।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সংরক্ষণ করা গেলে বিন্যাফর ভাসানী-স্মৃতি ভ্রমণের নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে গড়ে উঠবে।