
প্রীতম কান্তি গোপ, কুবি প্রতিনিধি
“পথে আছে ঘোর, পথে আছে বাধা, পথে আমি তোমাকেই খুঁজি!”
কবি নির্মলেন্দু গুণের এই পঙক্তিটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ের কথা। তাদের কাছে এই পথ মানে রুটিন মাফিক যাত্রা নয়; শহরের কোলাহল থেকে লাল মাটির নিরিবিলি ক্যাম্পাসে ছুটে আসার এক কাব্যিক আকাঙ্ক্ষা। আর এই যাত্রার সবচেয়ে চেনা সঙ্গী কুবির লাল-নীল রঙের বাসগুলো।
যা কুবিয়ানদের কাছে কেবল একটি পরিবহন নয়, বরং তাদের সুখ-দুঃখের আস্থা এবং তাদের একমাত্র ভরসার প্রতীক।
আবাসিক সংকটে জর্জরিত ক্যাম্পাসটিতে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ থাকে শহরে। যারা প্রতিনিয়ত ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকার এক নিদারুণ যন্ত্রণা অনুভব করে। ক্লাস বা পরীক্ষার প্রয়োজন ছাড়া ক্যাম্পাসের প্রাণবন্ত আড্ডা, কিংবা মুক্ত পরিবেশে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ তাদের দুর্লভ। এই দূরত্ব ঘোচানোর একমাত্র ক্ষেত্রই হলো বাসের জীর্ণ চাকাগুলো, যা দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে এই গুরুদায়িত্ব পালন করছে প্রতিনিয়ত।
কুবির লাল-নীল রঙের বহরগুলো কেবল ইস্পাত আর যন্ত্রাংশের সমাহার নয়। দীর্ঘ দুই দশকের পথচলায় এতে জমেছে অজস্র স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার ছাপ। পুরোনো, একটু জীর্ণ, সিটে বসলে কিচিরমিচির শব্দ হয়, ইঞ্জিনের আওয়াজও বেশ চেনা, যা তাদের হৃদয়ে ক্যাম্পাসের প্রতি একটা টান অনুভব করায়।
বাসের প্রতিটি অংশ এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে হাজারো কুবিয়ানের ব্যক্তিগত গল্প, গোপন কথা আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনাকে। আর এই সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে আছে বাসের প্রতিটি সিট, প্রতিটি হ্যাণ্ডেল এবং জানালাগুলো।শিক্ষার্থীদের কাছে এই বহরগুলোই জীবনের গতিপথ, যা শহরের সঙ্গে ক্যাম্পাসের পড়াশোনার সময়সূচি মিলিয়ে দেওয়ার একমাত্র অবলম্বন।
বাসের প্রতিটি সিট, প্রতিটি জানালা যেন নীরবে শুনে যায় শিক্ষার্থীদের কথা। কেউ বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠে, কেউ চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। আবার কখনো জ্যামের মধ্যে আটকে পড়লে বাড়ে দুশ্চিন্তা ক্লাস মিস হবে কি না।
এই সময়টাতেই চালক মামাদের দিকে তাকিয়ে থাকে সবার চোখ। কখনো অনুরোধ, কখনো তাড়া। কারণ শিক্ষার্থীরা জানে, সময়মতো ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর দায়িত্বটা অনেকটাই এই মানুষগুলোর ওপর।
দীর্ঘদিনের নীল ২৫ নম্বর বাসের অভিজ্ঞ চালক আব্দুল সামাদ মামা শিক্ষার্থীদের আস্থার বর্ণনা দেন এক গভীর প্রশান্তিতে। তিনি বলেন, “জ্যামে পড়লে অনেকেই তাড়াতাড়ি যেতে বলে। কেউ কেউ একটু রাগ করেও কথা বলে। কিন্তু ওদের কথার পেছনের কারণটা আমরা বুঝি। কারও পরীক্ষা, কারও খুব দরকারি ক্লাস। তখন শুধু স্টিয়ারিং ধরি না, ওদের অস্থিরতাটাও যেন হাতে চলে আসে।”
মামাদের জীবনে যেন তখন একটাই লক্ষ্য হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের সঠিক সময়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে দেওয়া।
আব্দুল সামাদ মামার মতো চালকদের এই দীর্ঘ দুই দশকের কর্মজীবন যেন কেবল নিছক রুটিরুজি নয়, এক দীর্ঘ কাব্য এবং যার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে শতশত কুবিয়ানের গল্প। মামাদের জীবনের একটা বৃহৎ অংশ আবর্তিত হয়েছে চাকা, স্টিয়ারিং এবং বাসের অভ্যন্তরের হাসিকে কেন্দ্র করে।
এবিষয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে আব্দুল সামাদ মামা আরো বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাস চালাচ্ছি,হাজারো শিক্ষার্থীদেরকে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছি। সিটে বসে,দাঁড়িয়ে কিংবা দরজায় ঝুলে যাওয়া শিক্ষার্থীরাই আজ শিক্ষক, ক্যাডার, ইঞ্জিনিয়ার বা কত বড় বড় জায়গায়! উনাদের এই সফলতা দেখলে আমাদের গর্ব হয়। মনে হয় উনাদের যাত্রায় আমরা একটু হলেও ছিলাম।”
সাধারণ মানুষের চোখে লাল-নীল রঙের এই বাসগুলো হয়তো কেবল শিক্ষার্থী বহনকারী পরিবহন মাত্র। তবে কুবিয়ানদের কাছে এগুলো কেবল বাস নয় বরং এক টুকরো আবেগ, এক টুকরো নস্টালজিয়া।
লাল-নীল রঙের এই বাসগুলোর বর্ণনা করে কুবির ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসাইন জানান, “শহর-ক্যাম্পাসের এই যাত্রাপথে লুকিয়ে আছে এক আলাদা অনুভূতি। সকালের স্টপেজে দাঁড়ালে শুরুতেই যে চিন্তাটা আসে, সিট পাবো তো, সিটে বসে কিংবা ঠাসাঠাসি করে দাঁড়িয়ে যাওয়া সবকিছুর বাইরে গিয়ে বাসে উঠলেই কেমন যেন এক স্বস্তি অনুভূত হয়। যখন কুমিল্লার নিত্যদিনের জ্যামে বাসগুলো আটকা পরে তখন মনে হয়, রাস্তাটাই যেন থেমে গেছে। তবে জ্যামের মধ্যেও অন্যদের সাথে আড্ডা, কিংবা নিশ্চুপে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকা এসবের মধ্যে কখন যে সময় চলে যায়। প্রতিদিনের এই যাত্রা কখন যে অভ্যাস থেকে ভালো লাগায় পরিণত হলো, বুঝতেই পারিনি। শহর থেকে ক্যাম্পাসের এই দূরত্ব এখন আমার জন্য নিত্যদিনের এক ছোট্ট সফর। যা আমাকে বুঝিয়েছে, ক্লাস কিংবা পড়ার পাশাপাশি এই পথচলাটাও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান চর্চার একটা অংশ।”
দিনের শেষ বেলায় ক্লান্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাসগুলো যখন শহরমুখী পথে ছুটে চলে, তখন যেন বাসগুলোর মৃদু গর্জনে শোনা যায় এক অদৃশ্য স্বর, “আমি বিলাসবহুল কিছু নই, নেই কোনো শীততাপ যন্ত্র কিংবা নরম আসনে আরামের ছোঁয়া। কখনো তোমাদের যেতে হয় দাঁড়িয়ে, কখনও বা যেতে হয় ঝুলে। তবুও তোমাদের হাসি, গল্প আর স্বপ্নে আমি ভরে উঠি রোজ। বন্ধের দিনে যখন আমার গায়ে ধুলো জমে, তখনই বুঝি তোমাদের অনুপস্থিতিই আমার নিঃসঙ্গতা।”