
খুবি প্রতিনিধি : ফিরোজ হাসান
ঈদ মুসলিম উম্মাদের জন্য আনন্দ উৎসবের দিন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে ইদুল ফিতর প্রতিটি মুসলমানদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ঈদ শুধু উৎসব নয়,এটি মানুষের জীবনের গল্প বলার একটি সময়। ঈদকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের ভাবনায় আনন্দ ও দায়িত্ব দুটোই সমানভাবে উপস্থিত দেখে মেলে।তারা শুধু উৎসব উপভোগ করেন না, বরং ক্যাম্পাসের ঈদ উদযাপন, শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা এবং ফাঁকা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন। অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী বাড়ি যেতে না পারার বাস্তবতা এবং ক্যাম্পাসের মানবিক দিকগুলোও তাদের প্রতিবেদনে গুরুত্ব পায়। ফলে তাদের কাছে ঈদ শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের সময় নয়, বরং ক্যাম্পাস জীবনের নানা দিক তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এই বিষয়ে তাদের অনুভূতি, গল্প নিয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন ভোরের বাংলা নিউজ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি-ফিরোজ হাসান
মোঃ হাসিবুল হাসান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি,দৈনিক নয়া দিগন্ত
দীর্ঘ একমাস রোজার পর ঈদুল ফিতর আসে একরাশ স্বস্তি আর আনন্দ নিয়ে। ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা, সালামি আর সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসে ঈদের সেই অনুভূতি বদলেছে,
যোগ হয়েছে দায়িত্ব, ব্যস্ততা আর ভিন্ন এক বাস্তবতা।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা আর ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকায় রমজান মাসটা এখন ব্যস্ততার মধ্য দিয়েই কাটে। ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট, রিপোর্টিং সবকিছু সামলে রোজা রাখা সহজ না হলেও, এই সময়টা আমাকে বেশি শৃঙ্খলিত আর ধৈর্যশীল করে তোলে। ক্যাম্পাসে ইফতার ভাগাভাগি করা, সহপাঠীদের সঙ্গে সময় কাটানো এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই রমজানকে আলাদা করে তোলে।
ঈদ সময় যত ঘনিয়ে আসে, ততই মন পড়ে বাড়ি ফেরার কথা। ক্যাম্পাস থেকে বাড়ি ফেরার সেই যাত্রাটা যেন ঈদের আনন্দের শুরু। পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসা, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করা, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা এসব মিলিয়েই ঈদ হয়ে ওঠে পূর্ণ।
তবে এখনকার ঈদ আগের মতো নেই এটা স্পষ্ট। প্রযুক্তির কারণে যোগাযোগ সহজ হলেও, অনেকটাই অনলাইনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে সম্পর্কগুলো। ঈদের শুভেচ্ছাও এখন অনেক সময় স্ক্রিনেই আটকে থাকে। তাই আমার মনে হয়, অন্তত ঈদের সময়টাতে আমাদের বাস্তব সম্পর্কগুলোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
একজন সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী হিসেবে ঈদ আমাকে আরেকটা বিষয় মনে করিয়ে দেয় দায়িত্ববোধ। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের কথা ভাবা, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এটাই ঈদের আসল শিক্ষা। ঈদ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সবার মুখে হাসি ফোটে।
আমার কাছে ঈদ মানে শেকড়ে ফেরা, মানুষের কাছে ফেরা। ব্যস্ততার এই জীবনে অন্তত কয়েকটা দিন যেন আমরা আবার মানুষ হয়ে উঠতে পারি, একে অপরের পাশে দাঁড়াতে পারি এটাই ঈদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মিরাজ মাহমুদ
ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ
শিক্ষার্থী,নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(নোবিপ্রবি)
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি,পাবলিকিয়ান টুডে
ঈদ মানেই আনন্দের রঙ, নতুন জামার গন্ধ, প্রিয়জনের সাথে কিছু সুন্দর স্মৃতির সম্মিলন। ঈদের আনন্দের ভিন্নতা হলো সবার সাথে সেই আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়া, যেন এক মিলনমেলায় রুপ নেয় পুরো পরিবেশ। ঘরে ঘরে মিষ্ঠান্ন, সেমাই, পায়েশ আর হরেক রকম নাস্তার আয়োজন কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঈদের অনুভূতিও অনেকের কাছে বদলে যায়। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ঈদের আনন্দের সংজ্ঞাটা যেন একটু আলাদা। তাদের কাছে ঈদের আনন্দ মানে শুধু নতুন জামা বা মিষ্টি খাবারের উৎসব নয়; বরং লম্বা ছুটির খবর পাওয়া, তাড়াহুড়ো করে ব্যাগপত্র গুছিয়ে ফেলা, আর নাড়ির টানে দূরের পথ পেরিয়ে বাড়ির দিকে ছুটে চলা। তাই ঈদের ছুটি তাদের কাছে অন্যরকম এক আনন্দের বার্তা হয়ে আসে। লম্বা ছুটির ঘোষণা শুনলেই যেন ক্যাম্পাসে শুরু হয় ঘরে ফেরার প্রস্তুতি।
এইভাবেই ঈদ অনেকের কাছে হয়ে ওঠে এক ভিন্ন অনুভূতির গল্প। নতুন জামার গন্ধ বা মিষ্টি খাবারের আনন্দের পাশাপাশি থাকে দূর থেকে ঘরে ফেরার আকুলতা, প্রিয়জনদের কাছে ফিরে পাওয়ার উচ্ছ্বাস। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য ঈদের সবচেয়ে বড় আনন্দ লুকিয়ে থাকে সেই পথেই—যে পথে তারা ছুটে চলে নাড়ির টানে, আপন ঠিকানার দিকে।
জান্নাতুল ফেরদৌস প্রীতি,
লোকপ্রশাসন বিভাগ
শিক্ষার্থী,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি,দৈনিক পূর্বাশা, সত্য নিউজ
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা করতে গিয়ে রমজানের বেশিরভাগ সময়টাই কেটে যায় দায়িত্বের মধ্যে।পড়াশোনা, টিউশন – এইসব কিছুর পরেও একটি দায়িত্ব থাকে সেটি হলো নিজের ক্যাম্পাসের প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোকে তুলে ধরা। আর এই ব্যস্ততার মাঝেই ঈদের আনন্দটাকে আমি অন্যভাবে উপভোগ করি -কারণ আমি শুধু নিজের না, পুরো ক্যাম্পাসের গল্প বলি। ঈদের ছুটিতেও বিরাম নেই। নিউজ না করলেও বিভিন্ন ফিচার নিয়ে কাজ করতে হয়-যা আমার কাছে একটি অন্যরকম ভালোলাগার বিষয়। সবমিলিয়ে ক্যাম্পাস সাংবাদিক হিসেবে আমার ঈদের আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যায় যখন সবার বাড়ি ফেরার গল্প আর অনুভূতিগুলো তুলে সবার সামনে ধরতে পারি।
মো: বাপ্পি হোসেন
সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
শিক্ষার্থী, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পাবিপ্রবি)
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি,একুশে সংবাদ
ঈদ আমাদের ধর্মীয় উৎসব।এটি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে যায়।আমরা চাই প্রতিটি ঘরেই ঈদের আনন্দ পৌঁছে যাক এবং যাদের ঘর নেই তাদের হৃদয়ে ঈদের আনন্দ বয়ে যাক। বিশেষ করে পথশিশুদের ঈদ একটু ভিন্ন রকম হয়।নেই নতুন জামা, নেই বাবার হাত ধরে ঈদগাহে যাওয়া। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব বঞ্চিত শিশুদের মিডিয়ায় তুলে ধরা যাতে তাঁরাও ঈদ আনন্দের সাথী হতে পারে।
রাতুল সাহা
ওয়েট প্রসেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
শিক্ষার্থী,বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স),ঢাকা
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি,বাংলাভিশন
প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবেই থাকে এক ধরনের আন্তরিকতা, যা মানুষকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে। এছাড়া উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার মধ্যেই মানবিকতার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। আমার কাছে ঈদও ঠিক তেমনই—শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার এক সুন্দর উপলক্ষ্য।
রমজান মাসে হলে থাকাকালীন মুসলিম বন্ধুদের সঙ্গে ইফতারে অংশ নেওয়াটা বিশেষ আনন্দের বিষয়। সবার সঙ্গে বসে একসাথে খাবার ভাগাভাগি করা ও আড্ডা দেওয়ার মুহূর্তগুলো যেনো ভিন্নধর্মী এক আনন্দ দেয়। ঈদের দিন বন্ধুদের কাছ থেকে দাওয়াত পাওয়া এবং সেই দাওয়াতে অংশ নেওয়াটাও উপভোগ করেছি।
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, ঈদের দিন প্রতিবেশী মুসলিম ধর্মালম্বীদের বাসায় সেমাই রান্না হয়। তাঁদের অনেকেই সেই সেমাই আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে খেতো এবং ঈদের নিমন্ত্রণ দিয়ে যেতো। আবার দুর্গাপূজার সময় আমাদের মুসলিম বন্ধুরা বাড়িতে আসে, নাড়ু-লুচি খায়, একসঙ্গে সময় কাটাই। পূজায় আমি যেমন বন্ধুদের আপ্যায়ন করে আনন্দ পাই, ঠিক তেমনি ঈদের দিন তাদের কাছ থেকেও দাওয়াত পাই। এই আদান-প্রদানটাই আমার কাছে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে সম্পর্ককে আরও কাছের করে তোলে। আমি মনে করি, ধর্ম আলাদা হলেও মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সম্মান আর একসঙ্গে থাকার মনটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমরা যদি একে অপরকে বুঝি আর সম্মান করি, তাহলে আমাদের সমাজ আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।
সবাইকে ঈদের অনেক শুভেচ্ছা।