
মো. নাজিউল্লাহ ভূইয়া
কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি (ঢাকা)
কেরানীগঞ্জের শাক্তা ইউনিয়নের নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজ। ঢাকা শহরের অদূরে অবস্থিত এই কলেজটি নামকরা কোনো প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই। নেই আধুনিক ল্যাব, ব্যয়বহুল কোচিং কিংবা বিশেষ কোনো সুবিধাও। কিন্তু এখানকার শ্রেণিকক্ষ থেকেই উঠে এসেছে দুইটি অনুপ্রেরণার গল্প—যা প্রমাণ করে, স্বপ্ন দেখার জায়গা ছোট হলেও লক্ষ্য হতে পারে অনেক বড়।
চলতি বছরের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজের দুই মেধাবী শিক্ষার্থী সাফিয়া রহমান পদ্ম ও জান্নাতুল রশিদ। সীমিত সুযোগ, আর্থিক বাস্তবতা ও মানসিক চাপের মধ্যেও অধ্যবসায় আর আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করে তাঁরা পৌঁছে গেছেন সাদা অ্যাপ্রনের স্বপ্নের দোরগোড়ায়। এই সাফল্য শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জয় নয়—এটি একটি কলেজ, একটি জনপদ এবং অসংখ্য স্বপ্নবাজ শিক্ষার্থীর আশার গল্প।
বাবার কড়া শাসন, মায়ের নীরব প্রার্থনা—পদ্মের দীর্ঘ প্রস্তুতি
সাফিয়া রহমান পদ্ম ভর্তি পরীক্ষায় ৪৫৩তম মেধাস্থান অর্জন করে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তিনি আনিসুর রহমান ও সাজিয়া আফরিনের কন্যা।
পদ্মের পরিবার জানায়, ছোটবেলা থেকেই তাঁর দিন শুরু হতো একটি নির্দিষ্ট রুটিনে। বাবা আনিসুর রহমান পড়াশোনার বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত নিয়মশৃঙ্খল। মোবাইল ফোন, অপ্রয়োজনীয় আড্ডা কিংবা সময় নষ্ট—সবকিছুর ওপর ছিল কড়া নিয়ন্ত্রণ। অন্যদিকে মা সাজিয়া আফরিন ছিলেন নীরব অনুপ্রেরণা—ভোরে উঠে সন্তানের জন্য দোয়া, পরীক্ষার আগের রাতে নিরব আতঙ্ক আর বিশ্বাসের আশ্রয়।
নিজের পথচলার গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পদ্ম বলেন,“অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। মনে হতো আর পারছি না। তখন আম্মু শুধু বলতেন—‘আল্লাহ ভরসা, চেষ্টা থামাস না।’ আর আব্বু আমাকে নিয়মের ভেতরে রাখতেন। এই দুই শক্তির মাঝেই আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছি।”
পদ্মের শিক্ষাজীবন শুরু থেকেই ছিল ঈর্ষণীয়। তিনি এসএসসি পরীক্ষায় অ্যালবাট্রস স্কুল থেকে জিপিএ–৫ (গোল্ডেন) এবং এইচএসসি পরীক্ষায় নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ–৫ (গোল্ডেন) অর্জন করেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে বড় কোনো কোচিংয়ে নিয়মিত যাওয়া সম্ভব হয়নি। বেশিরভাগ প্রস্তুতি ছিল কলেজের শিক্ষক ও নিজের আত্মশৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করে। ঢাকা বোর্ড থেকে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পাওয়া তাঁর সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি।
পদ্মের মা সাজিয়া আফরিন বলেন,“মেয়ে কখনো বিলাসিতা চায়নি। শুধু বলত—পড়তে দিও, সময় দিও। আমরা আল্লাহর কাছে শুধু এই দোয়া করেছি, ও যেন নিজের স্বপ্নে পৌঁছাতে পারে।”
হার না মানা আর এক যোদ্ধা জান্নাতুল রশিদ
অন্যদিকে, একই কলেজের আর একজন, মেধাবী শিক্ষার্থী জান্নাতুল রশিদ ও সরকারি মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ২৬৯৭তমমেধাস্থান অর্জন করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তিনি মো. হারুন অর রশিদ ও শাহানা আফরোজের সন্তান।জান্নাতুলের গল্পে আছে অপেক্ষা, না-পাওয়ার কষ্ট আর নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার দৃঢ়তা। প্রথমবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তিনি বেসরকারি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। অনেক আত্মীয়স্বজন, এমনকি পরিবারের সদস্যরাও তখন দ্বিধায় ছিলেন। কিন্তু জান্নাতুল নিজের ভেতরের কণ্ঠকে বিশ্বাস করেছিলেন।তিনি বলেন,“আমি জানতাম, আমি পারব। শুধু আরেকটু সময় দরকার। সরকারি মেডিকেলে পড়াটা আমার কাছে শুধু সুযোগ নয়, দায়িত্ব মনে হয়েছে।”
এক বছর ঘরে বসে আবার প্রস্তুতি—বন্ধুদের অনেকে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন জীবন শুরু করেছে, জান্নাতুল তখন বইয়ের পাতায় নিজেকে আটকে রেখেছিলেন। সামাজিক চাপ, মানসিক একাকিত্ব—সবকিছুর মাঝেও ভেঙে পড়েননি।
জান্নাতুলের মা ( নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজের ইংরেজি শিক্ষক) শাহানা আফরোজ বলেন,
“মা হিসেবে ভয় ছিল। কিন্তু শিক্ষক হিসেবে বিশ্বাস ছিল। ও বলেছিল—‘আমাকে আরেকবার চেষ্টা করতে দাও।’ আজ মনে হয়, সেই সিদ্ধান্তটাই ছিল জীবনের সেরা।”
শিক্ষকদের ছায়া, প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত্তি
এই দুই শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে রয়েছে নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকদের নিরব শ্রম। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মাঝেও তাঁরা নিয়মিত অতিরিক্ত ক্লাস, মানসিক সমর্থন ও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মালেক মিয়া বলেন, “পদ্ম ও জান্নাতুল আমাদের গর্ব। তারা প্রমাণ করেছে—কলেজ বড় না হলেও স্বপ্ন বড় হতে পারে। আমরা চাই, তারা শুধু ভালো ডাক্তার নয়, ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠুক।”
তিনি আরও জানান, বিগত বছরগুলোতেও এই কলেজ থেকে বহু শিক্ষার্থী সরকারি মেডিকেল কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এবারের সাফল্য নতুন শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখার সাহস দেবে। নয়াবাজার ডিগ্রি কলেজ পরিবার এই দুই কৃতী শিক্ষার্থীর জন্য দোয়া করছে— যেন তারা চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রনের ভেতরেও মানুষের কষ্ট বোঝে মানবিক ডাক্তার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
দুটি নাম, অসংখ্য স্বপ্নের ঠিকানা
“সাফিয়া রহমান পদ্ম ও জান্নাতুল রশিদ। দুটি নাম, কিন্তু স্বপ্নজয়ের হাজারো ঠিকানার প্রতিচ্ছবি। সীমিত সুবিধা আর প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের অদম্য আত্মবিশ্বাস ও অবিচল অধ্যবসায় আজ গ্রামের হাজারো শিক্ষার্থীর অনুপ্রেরণার উৎস। এটি কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, স্বপ্নকে সত্য করার এক সম্মিলিত বার্তা।”