
শেখ ফয়সাল আহমেদ
সাধারণত কোন সরকারি কর্মচারী বা কর্মকর্তা কোন অনিয়ম দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়লে প্রাথমিক তদন্ত প্রমাণিত হলে তাকে বিভিন্ন শাস্তির মুখে পড়তে হয় কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরে একজন প্রকৌশলীর ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টো। গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব যার চাকরি জীবনের পুরোটা সময় জুড়েই রয়েছে শুধু অনিয়ম দুর্নীতি অর্থ আত্মসাৎ সহ নানা অপরাধের গল্প। সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব যেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের অঘোষিত সম্রাট, এত অভিযোগ থাকার পরও ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং পেয়ে বসে আছেন বহাল তবিয়তে।
গণপূর্ত নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিব ২৭তম বিসিএস গণপূর্ত ক্যাডারে ২০০৮ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে কর্মজীবনের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন নানা অনিয়ম দুর্নীতিতে অবৈধ অর্থের লোভে।
নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব কর্মস্থলের অধিকাংশ জায়গায় করেছেন বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি, তৈরি হয়েছে তার বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক, দেশের শীর্ষ একাধিক গণমাধ্যমে একের পর এক তার বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল! শাস্তিস্বরূপ শুধু কিছুদিনের জন্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বদলি এবং নতুন কর্মস্থলে গিয়ে প্রতিটি জায়গায় করেছেন আবারও সেই একই অপকর্ম।
আশ্চর্যের বিষয় এত অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও তিনি বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর ৩ নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব রয়েছেন।
২০১৯ সালে হবিগঞ্জে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক ৬ষ্ঠ তলাবিশিষ্ট হাসপাতালের ভবন নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে একাধিক গনমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছেছিল। শুরু থেকে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিব অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি একাধিক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন কোন অনিয়ম হয় নি।
তবে গনমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করে প্রমাণ পেয়েছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তৎকালীন জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক অজয় কুমার সাহা তদন্তে অনিয়মের হয়েছিল এবং নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিব সহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন।
নোয়াখালীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরের মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য জেলার ৪৮টি স্থাপনার ৬৮টি কাজের জন্য পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। যার মেয়াদ ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত ছিল। এর আগেই বরাদ্দপ্রাপ্ত সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছিল। অথচ অধিকাংশ কাজ ছিল অসমাপ্ত।
২০২২ সালের জুন মাসে মেয়াদ শেষ হওয়া নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগের আরএপিপিসহ (মেরামত) বিভিন্ন প্রকল্পের সাত কোটি টাকার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে দেশের একাধিক শীর্ষ গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিব অনিয়মতান্ত্রিকভাবে এসব কাজ করিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছিল।
২০২৩ সালে ঘুসের টাকা না পেয়ে ঠিকাদারকে হেনস্তার অভিযোগে নোয়াখালীর তৎকালীন গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিবসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন ওমর সাহেদ রিশাদ নামে এক ঠিকাদার।
একের পর এক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তৎকালীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর শামীম আখতার ২০২৩ সালের ২১ শে মার্চ তাকে নোয়াখালী গণপূর্ত বিভাগ থেকে ফেনী গণপূর্ত বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল।
সেই সময়ে প্রজ্ঞাপন জারির পর বদলি ঠেকাতে তৎকালীন লীগ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী সচিবসহ বিভিন্ন মহলে তদবির করেছিলেন সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিব।
সেই প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির প্যাডে স্বাক্ষরযুক্ত একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করে তা ৮ এপ্রিল গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়ে বদলি ঠেকানোর চেষ্টা করেন। ডিও লেটারের কারণে ৮ এপ্রিল তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারের স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে তার ওই বদলির প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত করে দেওয়া হয়ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই ডিও লেটারটি গত ১৫ এপ্রিল ভুয়া বলে প্রকাশ পেয়েছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি হয়েছিল ।
এরপর অভিযোগ আছে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আক্তার অবৈধভাবে ঘুষ গ্রহণ করে প্রকৌশলী আন্দালিবকে শাস্তির হাত থেকে রক্ষা করে ২৩ এপ্রিল স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে নোয়াখালী থেকে লালমনিরহাট গণপূর্ত বিভাগে বদলি করা হয়েছিল।
নির্বাহী প্রকৌশলী আন্দালিব রহমানের বিরুদ্ধে অধিদপ্তর থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হলেও সেই কমিটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
লালমনিরহাটে যোগদান করে তৈরি করেছিলেন বিভিন্ন অনিয়ম বিতর্ক খুব স্বল্প সময়ে এর চার মাস পরে ২০ অগাস্ট তাকে তার ইচ্ছে অনুযায়ী আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণপূর্তে বদলি করেছিলেন তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী।
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের প্যাডে ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করে তৎকালীন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে বোকা বানিয়ে নিজ বদলি স্থগিত করা গণপূর্ত বিভাগ নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী সা’দ মোহাম্মদ আন্দালিবকে চাকুরিচ্যুত ও তার শাস্তি দাবি করে মানববন্ধন করেছিল ঠিকাদার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
২০২৫ সালের ১১ ই আগস্ট প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সামনে মসজিদের মুসল্লিরা মসজিদের নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রী লাগানোর বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন এবং সেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোহাম্মদ আন্দালিব উপস্থিত ছিলেন পরে সাংবাদিকদের কাছে তৎকালীন ধর্ম উপদেষ্টা বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
এত এত অনিয়ম দুর্নীতি অপকর্মের তালিকা এর পরও তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের কয়েকজন দুর্নীতিবাজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ঘুষ দিয়ে শাস্তির বদলে ঢাকায় প্রাইজ পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন বদলি হয়ে ঢাকা গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর ৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বে আছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিবের বিরুদ্ধে রয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অভিযোগের সত্যতা জানতে আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায় রাজধানীর ধানমন্ডির ১০ নাম্বার রোডের ৩ তিন নম্বর বাড়ি লরেল লেকউড এই ভবনের বি/৪ বিলাসবহুল ফ্লাটে বসবাস করেন যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় কয়েক কোটি টাকা ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য রয়েছে একটি নিজস্ব প্রাইভেট কার তার গাড়ির নম্বর ঢাকা মেট্রো গ ১৯-০৯৬০।
এছাড়াও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে রাজধানীতে তার একাধিক প্লট ফ্লাট ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে এবং নিজ জন্মস্থান পাবনাতেও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমাদের অনুসন্ধান চলাকালীন অবস্থায় আসাদ নামে এক ব্যক্তি +880173….995 এই নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে নিজেকে নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মুহাম্মদ আন্দালিবের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের নাম দিয়ে ভয়-ভীতি দেখানোর চেষ্টা করেন।
পরবর্তীতে নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন এই নামে আমার কোন চাচাতো ভাই নেই এবং সেই নাম্বার তার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠালেও তিনি জানান এই ব্যক্তি তার কেউ নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক একাধিক কর্মকর্তা বলেন নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মুহাম্মদ আন্দালিবের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকার পরও কেন তাকে ঢাকায় প্রাইজ পোস্টিং দেওয়া হল সেটা আমরা জানি না তবে এই ধরনের অনিয়ম ও বিতর্কিত ব্যক্তিকে যদি শাস্তির আওতায় না আনা যায় তাহলে আইনের সুশাসন সরকারি অধিদপ্তর গুলোতে প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্নীতি ও অনিয়ম করার জন্য আরও উৎসাহিত হয়ে পড়বে।
দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক সূত্র থেকে জানা গিয়েছে কারো বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় ওই ব্যক্তির আরো অনিয়ম দুর্নীতির তথ্য উদঘাটন হলে সেগুলো তদন্ত এবং অনুসন্ধানের আওতায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বিশেষ করে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তথ্যগুলো খুব গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করে দেখা হয়।
এই সকল অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত ৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী সাদ মোঃ আন্দালিবের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এমনকি তার হোয়াটসঅ্যাপে সম্পূর্ণ অভিযোগের বিষয় পাঠিয়েও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।