
রমজানের শেষ ১০ দিন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ রহমতের সময়। এই দিনগুলোতে মুমিনরা বেশি বেশি ইবাদত করে, নিজেদের পাপমুক্তির জন্য প্রার্থনা করে এবং লাইলাতুল কদরের সন্ধান করে। রাসূল (সা.) এই দিনগুলোতে ইবাদতে আরও মনোযোগী হতেন। কীভাবে এই মহিমান্বিত দিনগুলোর সর্বোচ্চ ফায়দা নেওয়া যায় তা নিয়ে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনা তুলে ধরেছেন –
এ এ এইচ সিয়াম
শিক্ষার্থী
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
রামাদানের শেষ মুহূর্ত—ফিরে আসার এক সুবর্ণ সুযোগ
রামাদান বিদায়ের পথে, সময়ের চাকা দ্রুত ঘুরে চলছে। কিন্তু এখনো আপনার জন্য দুয়ার খোলা। হয়তো আপনি এখনো গভীরভাবে রামাদানের মাহাত্ম্য অনুভব করতে পারেননি, ইবাদাতে একাগ্রতা খুঁজে পাননি, অন্তরে প্রশান্তির পরশ লাগেনি। চারপাশে মানুষ ইবাদাতে মশগুল, কেউ কুরআন তিলাওয়াতে রত, কেউ লাইলাতুল কদরের সন্ধানে রাত্রি জাগরণে মগ্ন। অথচ আপনার হৃদয় যেন শূন্য, আবেগহীন, কাঠিন্যে মোড়ানো!
তবে সুখবর হলো—আল্লাহর রহমত এতটাই বিশাল যে, তিনি মুহূর্তের মধ্যে আপনার অবস্থান বদলে দিতে পারেন। তিনি বলেন:
“হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দেন। তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।” (সূরা আয-জুমার: ৫৩)
এই আয়াত কি যথেষ্ট নয় আমাদের জন্য? যেখানে মহান রব নিজেই ডাকছেন, “তোমরা নিরাশ হয়ো না!” তাহলে আমরা কেন তার রহমত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব?
লাইলাতুল কদর—এক রাতের ইবাদতে ৮৪ বছরের সওয়াব
এখন রামাদানের শেষ দশকের গুরুত্বপূর্ণ রাত। হতে পারে, এটাই লাইলাতুল কদর! যে রাত সম্পর্কে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:”নিশ্চয়ই আমি কদরের রাতে কুরআন নাজিল করেছি। আর তুমি কী জানো কদরের রাত কী? কদরের রাত হলো এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম!” (সূরা আল-কদর: ১-৩)।ভাবুন, এই রাতে যদি আপনি একটি নফল নামাজ পড়েন, একটি তাসবিহ বলেন, একটি দোয়া করেন—আপনার আমলনামায় ৮৪ বছরের ইবাদতের সওয়াব লেখা হবে! এমন সুবর্ণ সুযোগ আর কোথায় পাওয়া যাবে?
তওবার দরজা এখনো খোলা
হয়তো আপনি ভাবছেন, “আমি অনেক গুনাহ করে ফেলেছি, আল্লাহ কি আমাকে মাফ করবেন?” রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:”যে ব্যক্তি অন্তর থেকে খাঁটি তওবা করে, আল্লাহ তার গুনাহকে এমনভাবে মাফ করে দেন যেন সে কখনো সেই পাপ করেনি।” (ইবন মাজাহ: ৪২৫০)।সুতরাং, আপনি যতই পাপ করে থাকুন না কেন, এই মুহূর্তে যদি আল্লাহর দরবারে ফিরে আসেন, তিনি আপনাকে ক্ষমা করবেন।
শেষ সময়ে বিজয়ীর মতো ছুটুন
আমাদের পূর্বসূরিরা রামাদানের শেষ দশকে নিজেদেরকে আরও বেশি ইবাদতে ডুবিয়ে দিতেন। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন রমাদানের শেষ দশকে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি রাত জাগতেন, পরিবারের সবাইকে জাগাতেন এবং ইবাদাতে অধিক মনোযোগী হতেন।” (বুখারি: ২০২৪, মুসলিম: ১১৭৪)
আমরা কি সেই সুন্নাহকে অনুসরণ করব না?
এখনো সময় আছে—আল্লাহর কাছে ফিরে যান
অনেকেই মনে করেন, “আরেকটা বছর আসবে, তখন ভালোভাবে ইবাদাত করব।” কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত যে আপনি আরেকটি রামাদান পাবেন?রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:”সুযোগ থাকতেই পাঁচটি জিনিসকে গ্রহণ করো: (১) বৃদ্ধ হওয়ার আগে তোমার যৌবনকে, (২) অসুস্থ হওয়ার আগে তোমার সুস্থতাকে, (৩) দরিদ্র হওয়ার আগে তোমার সম্পদকে, (৪) ব্যস্ত হওয়ার আগে তোমার অবসরকে, (৫) মৃত্যুর আগে তোমার জীবনকে।” (হাকিম: ৭৮৪৬)। এখনো সময় আছে! আল্লাহর দিকে ফিরে যান, তাহাজ্জুদের মেহরাবে দাঁড়ান, হাত তুলে দোয়া করুন, অশ্রু ঝরান, কুরআনে মনোযোগ দিন।
এই রামাদানই হতে পারে আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ রামাদান
রামাদান শেষ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এই শেষ সময়ে আপনি যে আমল করবেন, সেটাই হতে পারে আপনার জান্নাতের চাবিকাঠি।”যে ব্যক্তি শেষ সময়ে ভালো আমল নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, সে ভালো পরিণতি লাভ করবে।” (তিরমিজি: ২১৪১)।এখনো সময় আছে—নিজেকে বদলানোর, আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার, কদরের রাতের সর্বোচ্চ ফায়দা নেওয়ার।
উঠুন, ফিরে আসুন!রামাদান চলে যাচ্ছে, কিন্তু আপনার সুযোগ এখনো শেষ হয়নি। ইতিহাসে অনেক মানুষ জীবনের শেষ সময়ে আমল বাড়িয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আপনি কি সেই তালিকায় থাকতে চান না?আল্লাহ আপনাকে ডাকছেন। আপনি কি সাড়া দেবেন?”আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা আয-জুমার: ৫৩)
আইয়ূব হুসাইন
সহকারী শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল, ঢাকা- ১০০০
রমজানের শেষ তিন দিনে করণীয়
পবিত্র রমজানের প্রতিটা সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বরকতময়। এ সময় বেশি করে ইবাদত করা, দোয়া করা এবং আত্মশুদ্ধির জন্য চেষ্টা করা উচিত। বেশি করে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা উচিত, বিশেষ করে শবে কদরের সন্ধানে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া।
আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অতীতের ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত হওয়া দরকার। যারা অভাবী, তাদের সাহায্য করা, ফিতরা আদায় করা এবং দান-খয়রাত করা উচিত। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়দের খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রতিবেশীদের সহায়তা করা। ঈদকে ইবাদত ও খুশির আমেজে উদযাপনের জন্য মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি নেওয়া।
রমজানের শেষ দিনগুলো যেন শুধু উৎসবের প্রস্তুতিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং আমরা ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি। সবার জন্য শুভকঈদের শুভেচ্ছা ঈদ মোবারক।
তাজিম হোসেন
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
মাহে রমজান ও শেষ দশ দিনের অনুভূতি
রমজান আত্মশুদ্ধির মাস, সংযমের মাস। পুরো রমজানজুড়েই আমরা আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের প্রত্যাশায় থাকি। তবে মাহে রমজানের শেষ দশ দিন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে আমরা আরও বেশি ইবাদতে মগ্ন হই, রাতের বেলা তাহাজ্জুদ ও নফল নামাজ আদায় করি, কোরআন তিলাওয়াত করি এবং দান-সদকা করার মাধ্যমে সওয়াব অর্জনের চেষ্টা করি।
লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত এই শেষ দশকের মধ্যেই রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। তাই আমরা শিক্ষার্থীরা এই সময়ে চেষ্টা করি গুনাহ থেকে বিরত থাকতে, আত্মবিশ্লেষণ করতে এবং আগামী দিনগুলোর জন্য আত্মিকভাবে প্রস্তুত হতে।
তানভীরুল ইসলাম খান
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়