
কোটচাঁদপুর প্রতিনিধিঃ
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার ঝামাঘাটা গ্রামে রবিবার (৩০ নভেম্বর) বিকাল তিনটায় শহীদ ইসরাইল হোসেনের ১৩তম শাহাদাত বার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইসরাইল হোসেন ২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ১৮ দলের অবরোধ চলাকালে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর ঝিনাইদহ-৩ (কোটচাঁদপুর-মহেশপুর) আসনের সাবেক প্রার্থী ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মতিয়ার রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রশিবির ঝিনাইদহ জেলা সভাপতি আরিফ হোসেন এবং জেলা সেক্রেটারি ওবায়দুর রহমান খান।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন—কোটচাঁদপুর উপজেলা আমির মাওলানা তাজুল ইসলাম, উপজেলা সহ-সেক্রেটারি মাস্টার মশিউর রহমান, উপজেলা বায়তুলমাল মাস্টার রেজাউল হোসেন, কুশনা ইউনিয়ন আমির মাওলানা আতিকুর রহমান, কুশনা ইউনিয়নের সাবেক আমির ও সাবেক চেয়ারম্যান, এসবি কে ইউনিয়ন সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শরিফুজ্জামান শাওনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
২০১৩ সালের সেই দিনের স্মৃতি
২০১৩ সালের ৩০ নভেম্বর ১৮ দলের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে কোটচাঁদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মিছিল শুরু হলে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালায়। মুহূর্তেই পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়তে থাকে। এ সময় মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কোটচাঁদপুর ডিগ্রি কলেজের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও ছাত্রশিবির কর্মী মো. ইসরাইল হোসেন (২১)। তার মাথার পাশ দিয়ে দূরত্ব থেকে ছোঁড়া একটি গুলি শরীর বিদ্ধ করে। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসা শুরুর আগেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন।
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
শহীদের জীবনী
১৯৯২ সালের ১০ ডিসেম্বর ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার হরিণদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ইসরাইল হোসেন। তিনি ছিলেন বৃদ্ধ পিতা-মাতা—আব্দুস শহীদ ও আনোয়ারা বেগমের বার সন্তানের মধ্যে নবম। অধ্যয়ন ও চরিত্রে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, নরম-সুরের, ধর্মপ্রাণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ। সংগঠনে তিনি ইউনিট সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
শাহাদাতের আগের দিন
শাহাদাতের মাত্র একদিন আগে তিনি ব্যবসায়িক কাজে সাতক্ষীরা যান। সেখানে অবরোধ কর্মসূচির খবর পেয়ে পিতাকে বলেন—
“আগামীকাল আমার পরীক্ষা আছে, আমাকে যেতেই হবে।”
রাতেই তিনি বাড়ি ফিরে আসেন এবং সকালে মিছিলে যোগ দিতে বের হওয়ার সময় ভাতিজাকে বলেন—
“দোয়া করো, আমি যেন শহীদ হতে পারি। আমার কাজগুলো তুমি দেখে রেখো।”
মায়ের কাছেও দোয়া চেয়ে বেরিয়ে যান। আর সেদিনই তিনি ফিরে আসেন শহীদের মর্যাদা নিয়ে।
পরিবারের হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণ
পিতা আব্দুস শহীদ বলেন—
“আমার সব সন্তানদের মধ্যে সে ছিল সবচেয়ে ভালো। বাড়ি থেকে বের হবার সময় বলেছিল—‘আব্বা, আমি পরীক্ষা দিতে যাচ্ছি, দোয়া করো যেন পাস করি।’ আমার ছেলে সত্যিই পরীক্ষা পাশ করেছে—সে জান্নাতে চলে গেছে।”
মাতা আনোয়ারা বেগম বলেন—
“আপনারা আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন তাকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমিন।”
দোয়া মাহফিলে বক্তারা যা বলেন
বক্তারা বলেন, ইসরাইল হোসেন ছিলেন আদর্শবান, দৃঢ়চেতা ও সাহসী একজন সংগঠক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মিছিলে তিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন। তার শাহাদাত দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
শেষে শহীদ ইসরাইল হোসেনসহ সকল শহীদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে মুনাজাত পরিচালনা করা হয়।