
মো. নাজিউল্লাহ ভূইয়া
কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি
কেরানীগঞ্জের আটি বাজার, নয়াবাজার, বামনশুর ও খোলামোড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান গ্যাস সংকট এখন মানুষের সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ভোরে চুলা না জ্বলা, দুপুরে রান্না বন্ধ থাকা , সিলিন্ডারের ক্রমবর্ধমান খরচ—সবকিছু মিলিয়ে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যে দিন কাটছে হাজারো পরিবারের। সকালে চুলা না জ্বলার কারণে শিশুদের না খেয়ে স্কুলে যাওয়া, কর্মজীবী মানুষের তাড়াহুড়ো, রোগীর জন্য খাবার তৈরির অনিশ্চয়তা—সবই জমে ওঠেছে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ হিসেবে। এই অসহায়তার চরম প্রকাশ হিসেবে আজ শাক্তা ইউনিয়নের শিকারিটোলায় স্থানীয়দের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও গণস্বাক্ষর কর্মসূচি।
মানববন্ধনে স্থানীয় জনগণের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সাধারণ মানুষ ছাড়াও অংশ নেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, আলেম সমাজ ও হাজারো নারী। গ্যাস সংকটের কারণে প্রতিদিনের জীবন যেমন থমকে গেছে, তেমনি রাতভর চুলা ধরানোর অপেক্ষা—সবই মানববন্ধনে উঠে আসে ক্ষোভ ও কান্নাজড়ানো অভিজ্ঞতা হিসেবে।
মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।মিছিলটি শিকারিটোলা থেকে শুরু করে আটি বাজার পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে । পথে পথে যোগ দেন আরও বহু ভুক্তভোগী নারী ও পুরুষ । বিক্ষোভকারীরা আটি–খোলামুরা প্রধান সড়কের শিকারিটোলা, প্যাসেফিক মোড় ও নয়াবাজার স্কুল মোড় অবরোধ করে ঘণ্টাব্যাপী যান চলাচল বন্ধ রাখেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ—আবাসিক এলাকায় গড়ে ওঠা কারখানাগুলোর অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিন-রাত চালু থাকার কারণে সাধারণ মানুষ চুলায় আগুনই ধরাতে পারে না। উপর্যুপরি কারখানার মালিকরা বড় মোটর চালিয়ে আবাসিক এলাকার জন্য বরাদ্দকৃত গ্যাস নিজেদের কারখানায় টেনে নিয়ে যায় ফলে আবাসিক
এলাকার সংযোগে গ্যাস থাকে না।
গৃহবধূ রুম্পা আক্তারের ক্ষোভভরা কণ্ঠে বলা কথাগুলো উপস্থিত অনেককেই আবেগাপ্লুত করে—“দিনে গ্যাস নাই, কিন্তু মাঝরাতে একটু আসে। তখন বাধ্য হয়ে রাত জেগে রান্না করি। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে যায়। কতদিন আর এভাবে চলবে?”
তার মতো আরও বহু নারী বলেন—গ্যাস সংকট তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অসহায়তা সৃষ্টি করেছে।
অবরোধ চলাকালে এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে শুরু হয় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজারো মানুষের স্বাক্ষর জমা পড়ে। আয়োজকদের ভাষায়—“এটাই আমাদের শেষ ভরসা, শেষ কণ্ঠস্বর। আমরা সংগৃহীত স্বাক্ষর তালিকা দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাবো। “
সমাবেশে বক্তব্য রাখেন শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আসলাম তালুকদার, সাবেক ব্যাংকার সাচ্চু মিয়া, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা এবং কয়েকজন গৃহিণী। বক্তাদের বক্তব্যে ছিল অসহায়ত্ব, ক্ষোভ, অসন্তোষ ও প্রতিবাদে ভরপুর। আয়োজকরা বলেন—
“গ্যাস সংকট এখন কেবল ভোগান্তি নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। শিশুদের খাবার নেই, রুগীদের জন্য রান্না অসম্ভব—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। গ্যাস না দিয়ে গ্যাস বিল আদায়—এটা অন্যায়, অবিচার।”
তারা আরও জানান—
“তিতাসের নীরবতা এখন মানুষের রোষের কারণ। সমাধান যদি দ্রুত না আসে, কেরানীগঞ্জের প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ব্লকেড হবে। তিতাস অফিস ঘেরাও করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো পথ থাকবে না।”
আজকের কর্মসূচিতে জনতার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা আর উপেক্ষার যে প্রবাহ দেখা গেল, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—কেরানীগঞ্জ আর নীরব থাকবে না।
মানুষের দাবি একটাই—
স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অবৈধ শিল্প কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্নে কঠোর, দ্রুত, দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া।