
যবিপ্রবি প্রতিনিধি
আরাফাত হোসেন অভি
একুশে ফেব্রুয়ারি বাংলার ইতিহাসে এক স্মরণীয় দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য ঢাকায় ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনে নেমেছিল। পুলিশের গুলিতে আহত বহু ছাত্র-ছাত্রী।তাদের আত্মত্যাগের স্মরণে আমরা এই দিনটি পালন করি। যাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারি তাদেরকে আজ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করি।
১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো কতৃক এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান জানান মাতৃভাষা হলো মানুষের পরিবারিক, সাংস্কৃতিক ও আত্মীয়তার প্রকাশের অদ্বিতীয় সাধন। আমরা বাঙালি,বাংলা হলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী মাতৃভাষা, যা আমাদের জাতীয় পরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মর্মবাহী হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে আছে অন্যান্য ভাষাকে ছাড়াই।
আমাদের গর্ব এই যে, বিখ্যাত জনসংখ্যাবিদ ও পুরষ্কারপ্রাপ্ত ঔপনিবেশিক লেখক পল রবার্ট মাণ্ডাল তাঁর গবেষণায় বাংলা ভাষাকে বিশ্বের সুন্দরতম ভাষা হিসাবে ঘোষণা করেছেন।
কিন্তু এই ভাষার পিছনে আছে করুন ইতিহাস।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোন ভাষা নেই যার জন্য জীবন দিতে হয়েছে।বাংলায় একমাত্র ভাষা যা বাঙালি তার রক্তের বিনিময়ে অর্জন করেছেন।
যার ফলশ্রুতিতে আমরা আজ কোন বাধা বিপত্তি ছাড়াই আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় মনের ভাব প্রকাশ করতে পারি।আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলে আমরা যে আত্মতৃপ্তি পায় তা অন্য ভাষায় কোনদিনই সম্ভব না।
বাংলা ভাষা সম্প্রসারণে এবং বিকাশে এবং সংস্কৃতির বিপুল অবদান রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বিকাশ এক ধরনের ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য হয় যা বাংলা ভাষা এবং সাংস্কৃতিক অবদানের মাধ্যমে ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মুকুন্দ লাল দত্ত এবং অন্যান্য সহিত্যিকের কাজ এই ভাষায় বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়েছে।
বাংলা ভাষা আমাদের প্রত্যেকের হৃদয় বহন করে সংস্কৃতি, স্বাধীনতা এবং অধিকার উপেক্ষা না করে। এহেন ভাষা যা প্রত্যেকের মনের সুর বেঁধে দেয় এবং আমাদের প্রাণের সাহিত্য-সংগীত বহন করে। তাই, বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব হল এটি বিকাশ, সম্প্রসারণ এবং রক্ষা করা।
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী শাফাত হোসেন মাসুম জানান মাতৃভাষা বাংলা আমার দৃষ্টিতে শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয় এটি আমার শিকড়, আমার সংস্কৃতি এবং আমার পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই এই সুন্দর মধুময় ভাষার প্রতি গর্ব অনুভব করেছি। আমাদের বাঙ্গালীদের কাছে বাংলা শুধু ভাষা নয় এটি আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের প্রতিফলন, এটি অতীতের গল্প এবং আগামী প্রজন্মের জন্য আশা স্বরূপ। আমার কাছে বাংলা ভাষা এতটাই শ্রুতি মধুর যে সেটা কথোপকথনই হোক বা সংগীত কবিতার মাধ্যমেই হোক, দীর্ঘ যাত্রার পর বাড়ি ফেরার মতো উষ্ণতা ও আপনতার অনুভূতি দেয়। যা আমাকে পৃথিবীর আর কোন ভাষায় অনুভব করাতে পারবেনা। আমার দৃষ্টিতে বাংলা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয় এটি আমার জীবনের অংশ।
ইংরেজি বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম সিয়াম জানান শহীদের মর্যাদা রক্ষায়, পুষ্প অর্পন ও শোক পালনই যথার্থ নয়
প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারী ( ৮ ই ফাল্গুন ) দিনটাকে আমরা আন্তজার্তিক মাতৃভাষা হিসাবে পালন করি কিন্তু ফেব্রুয়ারী তো ইংরেজী মাসের নাম । বাংলা মাসের তারিখটা আমরা কেন উল্ল্যেখ করি না ? অনেক যুক্তি আসতে পারে । কিন্তু সরাসরি বললে এটি একটি আমাদের দাসত্ব ।
আমরা বরাবরই ইংরেজদের দাস ।
মাতৃভাষা তো বাংলা , এ ভাষার ব্যবহার তো সর্বব্যাপী হওয়া চাই । তাহলে , শিক্ষাঙ্গন দিনলিপিতে কেন ইংরেজী দিনলিপি প্রাধান্য পেল ?
আমাদের প্রত্যক ঘরে ঘরে কেন ইংরেজী দিনলিপিটা বড় বড় করে লেখা?
তাহলে আমরা কী সেই শহীদ ভাইদের রক্তের মর্যাদা রাখতে পারলাম ? কেন বিমানবন্দর , বাজার গুলোতে ইংরেজী নির্দেশনা দেওয়া হয় ।
এদেশ তো স্বাধীন , রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষা অর্জন করেছি । তাহলে কেন আমাদের দাসত্ব ?
ভাষা শহীদেরা শুধু ভাষা নয়, আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করার জন্য জীবন দান করেছেন ।
আমরা কী পারছি সেই সংস্কৃতি লালন করতে ?
পোশাকে , খাদ্যে, জীবন ব্যবস্থাপনায় , শিক্ষায় যেন আমরা সেই ভাষা অপহরণ কারীদের অনুকরণ করে যাচ্ছি ।
‘‘মাগো ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে
নেবে কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না মা‘‘
আসলে কী ওরা কেড়ে নিলো নাকি আমরা নিজেরাই বিতাড়িত করলাম ?
উচ্চশিক্ষায় নজর দিন , গুরুরা আমাদের কোনদিকে ধাবিত করছে ?
জ্ঞান তো অনুধাবন ও প্রয়োগের বিষয় । এতে ইংরেজী ভাষার গুরুত্ব আসলো কীভাবে ? নাকি এখানেও দাসত্ব ?
বাংলা ভাষায় শল্য, প্রকৌশলী , বিজ্ঞান , আইন পড়ালে কী সমস্যা হতো ?
একজন ছাত্র বাংলা ভাষায় যতটা ধারন ও অনুধাবন করতে পারে অন্যভাষায় সেটা উপলব্ধী কী সহজ ?
অবশ্যই ইংরেজী ভাষা শিক্ষার অনেক গুরুত্ব আছে । তবে দাসত্ব করা উচিত নয় ।
সমস্যাটা কোন জায়গায় ? ইংরেজী ছাড়া উচ্চশিক্ষা অসম্ভব নাকি অনুবাদ করতে আপনাদের দূর্বলতা ?
আজ যারা বড় বড় কর্মকর্তারা ফুল দিচ্ছে , কালো তকমা ধারণ করছে, মোমবাতি প্রজ্বলন করছে , তাদের সন্তানদের তিনিরা কোন মাধ্যমে পড়ালেখা করাতে বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করে ? জাতির কাছে আমার প্রশ্ন ।
একদিনের সম্মান প্রদর্শন ভন্ডামি ছাড়া আর কিছু না ।
সুতরাং , আসুন । মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধায় নয় বরং আমরা ভাষাকে লালন করতে শিখি ।
এগ্রো প্রোডাক্ট প্রসেসিং টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মতেন বিকাশ ত্রিপুরা জানান ২১ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমি শ্রদ্ধা জানাই আমাদের এই মাতৃভাষা রক্ষার জন্য জীবনত্যাগি সেই ভাষা শহীদের। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে আমরা যুদ্ধ করে আমাদের মাতৃভাষা ছিনিয়ে এনেছি। আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাস করি আমরা সবাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা বললেও আমরা যারা বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী আছি আমাদেরও নিজস্ব একটি সুন্দর মাতৃভাষা আছে।যে ভাষা আমি আমার মায়ের কাছ থেকে শিখেছি,যে ভাষায় আমি কথা বলতে ভালোবাসি,যে ভাষায় আমি আমার মতো করে ভাব প্রকাশ করতে পারি,যে ভাষায় কথা বলতে পারলে আমি মনে মনে ভাবি,আর সেই ভাষা শহীদের শ্রদ্ধায় বুক উজাড় হয়, সেই ভাষা শহীদের ধন্যবাদ জানাই ১৯৫২ সালে যদি আমাদের ভাষা শহীদেররা যদি ভাষার জন্য যুদ্ধ না করত তাহলে আমি আজ স্বাধীনভাবে আমি আমার মাতৃভাষায় কথা বলতে পারতাম না।
আমি মতেন বিকাশ ত্রিপুরা,আমি ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের আদিবাসী, আর ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মাতৃভাষার নাম ”কক বরক” ভাষা।বর্তমানে আমরা পড়ালেখার জন্য হোক বা চাকরি সূত্রে হোক কিংবা অন্য জাতির সাথে যোগাযোগ রক্ষার্থে আমরা বাংলা বা ইংরেজি শিখছি যার জন্য আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সেই ভাষা।আস্তে আস্তে এখন আমরা নিজেদের মাতৃভাষার সাথে বাংলা আর ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলছি।আমি চাই আমাদের প্রতিটি জাতির মাতৃভাষাকে সুন্দর ভাবে চর্চা করার সুযোগ পাই।প্রতিটি জাতি তাদের সুন্দর মাতৃভাষার সংস্কৃতিটাকে ধরে রাখুক,হোক সে বাংলাদেশের বসবাসরত বাঙ্গালী কিংবা বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী। মাঝে মাঝে এমনো অনেক পরিস্থিতি স্বীকার হয়েছি অনেকে আমার মাতৃভাষা শুনতে চেয়েছে তাদেরকে আমি আমার মাতৃভাষা শুনিয়েছি অনেকে আমার ভাষা শুনে মুচকি হেসেছেন আর অনেকে আমার প্রতি গর্ব করে বলেছেন তুমি তোমাদের নিজস্ব সুন্দর মাতৃভাষা থাকার পরেও আমাদের সাথে বাংলায় কথা বলতেছ সত্যি গর্ব করার বিষয়,আর আমার মাতৃভাষা শুনে অনেকে হেসেছেন আমার তাদের জন্য কোনো অভিযোগ নাই তবে এটাই বলতে চাই একজন প্রকৃত মানুষ কখনো আরেকজনের ভাষাকে নিয়ে হাসতে পারে না।
অবশেষে এই ভাষার মাসে আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি আমাদের যে যার মাতৃভাষাকে সুন্দর ভাবে চর্চা করি আর অন্য জাতির মাতৃভাষাকে শ্রদ্ধা করি।বেঁচে থাকুক আমাদের সবার মাতৃভাষা। বেঁচে থাকুক সবার হৃদয়ে জীবনত্যাগি সেই ভাষা শহীদরা।