
কুবি প্রতিনিধি :
একুশ মানে কি কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল দাগে সীমাবদ্ধ ? কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লাল মাটির পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ভোরের কুয়াশা চিরে যখন প্রভাতফেরির সুর ভেসে আসে, তখন মনে হয় একুশ এখানে নিছক স্মৃতি নয়, এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
লাল মাটির এই ক্যাম্পাস যেন ৫২-এর সেই রাজপথের রক্তের রঙকে আজও ধরে রেখেছে। একুশের সকালে যখন শিক্ষার্থীরা পায়ে হেঁটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের দিকে এগোয়, তখন প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি প্রতিবাদের গল্প বলে। ডায়েরির পাতায় বা সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়ালে নয় একুশ এখানে ধরা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে আঁকা আলপনায়, ক্যাফেটেরিয়া কিংবা শহিদ মিনারের আড্ডায় চলা বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণের তর্কে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে বাঙালি ছিল সর্বদা সোচ্চার। ৭১-এর সংগ্রাম, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যেখানেই অন্যায়-অবিচার দেখা দেয়, বাংলার মানুষ সেখানেই প্রতিবাদ করে এসেছে। ৫২ যেন সেসব প্রতিবাদের পথপ্রদর্শক। বাঙালি জাতির এই বীরত্বগাঁথাকে সম্মান জানিয়ে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যার মাধ্যমে ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ বিশ্বমানবতার সম্পদে পরিণত হয়। বিশ্বের নানা দেশে এই দিনটি পালিত হয় ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা ও মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে। ফলে একুশের আবেদন ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বৈশ্বিক চেতনায় স্থান করে নিয়েছে।
লাল মাটির পাহাড়ঘেরা এই ক্যাম্পাসেও একুশ আসে গভীর শ্রদ্ধা, আবেগ ও দায়বদ্ধতার আবহে। প্রভাতফেরি, শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, কালো ব্যাজ ধারণ, আবৃত্তি ইত্যাদিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ। শিক্ষার্থীরা শুধু আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেয় না; তারা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে পাঠ্যবইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নিজেদের চিন্তা ও চেতনায় ধারণ করার চেষ্টা করে। আলোচনা সভা, দেয়ালপত্রিকা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা সবকিছুর মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্ম উপলব্ধি করে, একুশ মানে আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন থাকা। ফলে এখানে একুশ শোকের স্মৃতি থেকে শক্তির উৎসে রূপ নেয়।
ফেব্রুয়ারি শেষে পলাশ ঝরে যায়, কিন্তু কুবির লাল পাহাড়ে একুশের চেতনা ঝরে পড়ে না। শহিদ মিনারে রেখে আসা প্রতিটি ফুল শুকিয়ে গেলেও তার সুবাস থেকে যায় শিক্ষার্থীদের চিন্তায়, চেতনায় আর জীবনবোধে। একুশ কোনো পরাজয়ের কান্না নয়, বরং বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক গর্বিত পাহাড়ের নাম।