
মো নাজিউল্লাহ ভূইয়া
কেরানীগঞ্জ, ঢাকা
ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার কালিন্দি ইউনিয়নে একটি এয়ার ফ্রেশনার ও কেমিক্যাল উৎপাদনকারী কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার (আজ) দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে কালিন্দি ইউনিয়নের আড্ডা রেস্টুরেন্টের গলির শেষ প্রান্তে অবস্থিত ওই কারখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে কারখানাটিতে নিয়মিত উৎপাদন কার্যক্রম চলছিল। এ সময় হঠাৎ বিকট শব্দে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং কারখানার ভেতর ও আশপাশের এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির লোকজন আতঙ্কিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে বিস্ফোরণের তীব্রতায় কারখানার ভেতরে থাকা সাব্বির রহমান (২২) নামে এক শ্রমিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
নিহত সাব্বির রহমান পাবনা সদর থানার বাসিন্দা শরিফুল ইসলামের ছেলে। দুর্ঘটনার পর তার মরদেহ উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় সহকর্মীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এয়ার ফ্রেশনার তৈরিতে ব্যবহৃত দাহ্য রাসায়নিক উপাদান থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানান তারা।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কেরানীগঞ্জে আবাসিক এলাকার ভেতরে ছোট-বড় বহু কেমিক্যাল ও কারখানা দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এসব কারখানার অধিকাংশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল, যা যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এক স্থানীয় সেচ্ছাসেবী বলেন, “আজ একজন শ্রমিক মারা গেল, কাল আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটলে
দায়ভার কে নেবে? এক শ্রমিকের মৃত্যু শুধু
একটি দুর্ঘটনাই নয়, বরং স্থানীয় শিল্পকারখানার নিরাপত্তা, প্রশাসনিক তদারকি ও লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে অনেক গুলো গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। নিহত শ্রমিকের পরিবার কি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিপূরণ পাবে?দায়ী কারখানা মালিক বা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে কি ফৌজদারি মামলা হবে?কেরানীগঞ্জের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কারখানার বিরুদ্ধে কি সমন্বিত অভিযান চালানো হবে?আজএকজন শ্রমিকের মৃত্যু দিয়ে আবারও প্রমাণ হলো—নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা ছাড়া শিল্পায়ন শুধু উন্নয়ন নয়, বরং প্রাণঘাতী ঝুঁকি তৈরি করে।
ঘটনার খবর পেয়ে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ওমর ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং কারখানাটির লাইসেন্স, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনানুগ বৈধতা খতিয়ে দেখা হবে।তিনি আরও বলেন, “কারখানাটি যদি নিয়ম বহির্ভূতভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত শ্রমিকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর থেকে কারখানাটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আবাসিক এলাকার ভেতরে এ ধরনের কেমিক্যাল কারখানা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ। তারা এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।