
প্রীতম কান্তি গোপ, কুবি প্রতিনিধি
সনাতন ধর্মে মাস ও তিথির সঙ্গে জীবনের শুভ অশুভের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেই বিশ্বাস থেকেই পৌষ মাসকে লোকাচারে মলমাস বা অশুভ মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। এসময় বিবাহ, গৃহপ্রবেশের মতো বহু শুভ কাজ থেকে বিরত থাকার রীতি সনাতনীদের মাঝে প্রচলিত। তবে পৌষের শেষ আর মাঘের শুরুতে যে পুণ্যক্ষণ উপস্থিত হয়, সেটিই হলো মকর সংক্রান্তি। যাতে অশুভতার ঘটে অবসান আর শুভযাত্রার হয় সূচনা।
শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় মকর সংক্রান্তির তাৎপর্য সুস্পষ্ট। এদিন সূর্য নিজের কক্ষপথে পরিবর্তন এনে মকর রাশিতে প্রবেশ করেন। জ্যোতিষ ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সূর্যের এই উত্তরায়ণ গতি মানবজীবন ও প্রকৃতিতে শুভ শক্তির সঞ্চার করে। তাই মকর সংক্রান্তিকে কেবল একটি তিথি নয়, বরং শুভ সময়ের দ্বারোদ্ঘাটন হিসেবে দেখা হয়।
বাংলার গ্রামীণ জীবনে এই সময়ের গুরুত্ব আরও গভীর। নতুন ধান ঘরে ওঠে, কৃষকের ঘরে আসে পরিশ্রমের ফল। এই আনন্দঘন আবহেই বাংলায় পালিত হয় নবান্ন। নতুন শস্যকে কেন্দ্র করে কৃতজ্ঞতা, উৎসব আর ভাগাভাগির এক অনন্য সংস্কৃতি। নতুন চালের পিঠা-পুলি, খই, মুড়ি, গুড় সব মিলিয়ে মকর সংক্রান্তি বাঙালির ঘরোয়া আবেগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও এই দিনটির মাহাত্ম্য অপরিসীম। পুণ্যলাভের আশায় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শুভ তিথিতে গঙ্গাস্নান করেন। শাস্ত্রমতে, নির্দিষ্ট পুণ্যক্ষণে গঙ্গাস্নান করলে পাপক্ষয় ও আত্মশুদ্ধি ঘটে। তাই এই দিনে ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে স্নান, শুদ্ধ বস্ত্র ধারণ এবং সূর্যদেবের আরাধনা একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার।
মকর সংক্রান্তির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো পিতৃতর্পণ। পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্নদান ও তর্পণ করে সনাতনীরা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেন। বিশ্বাস করা হয়, এতে পিতৃপুরুষেরা তৃপ্ত হন এবং পরিবারে শান্তি ও মঙ্গল বর্ষিত হয়।
দিনের শেষভাগে গ্রাম কিংবা শহরের অলিতে-গলিতে শোনা যায় হরিনামের ধ্বনি। হরিনাম কীর্তনের মাধ্যমে ভক্তরা ভগবানের নামস্মরণে মগ্ন হন। বাড়িতে বাড়িতে বিতরণ করা হয় হরির লোট যা গড়ে উঠেছে ভক্তি ও সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে। এই সমবেত কীর্তন শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করার এক অনুষঙ্গ।
মকর সংক্রান্তি তাই শুধু একটি বিশেষ দিন নয়; এটি বিশ্বাস, সংস্কৃতি আর মানুষের ভালোবাসার এক মেলবন্ধন। এটি আমাদের শেখায়, রাত যত কালোই হোক, ভোরের আলো ফুটবেই।